আবু জাফর আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রিঃ) ২য় আব্বাসীয় খলিফা
Abu Jafar al-Mansur (754-775 AD) 2nd Abbasid Caliph

আবু জাফর আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রিঃ) ২য় আব্বাসীয় খলিফা

আবু জাফর আল-মনসুরের পরিচয়

আল-মনসুরের স্ত্রী ও সন্তান

সিংহাসনারোহণ

আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আল-মনসুর

আল-মনসুরের শাসনকাল

আব্দুল্লাহ-বিন-আলীর বিদ্রোহ

নাসিবিনের যুদ্ধ, ৭৫৪ খ্রি.

আবদুল্লাহর পরাজয় ও মৃত্যু

আবু মুসলিমের পরিচয়

আবু মুসলিমকে দরবারে আমন্ত্রণ

আবু মুসলিমের হত্যা

আবু মুসলিমের কৃতিত্ব ও চরিত্র

সানবাদের বিদ্রোহ

রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ

আলী সম্প্রদায়ের দমন

মুহাম্মদকে খিলাফত দানের প্রতিশ্রুতি

উত্তর আফ্রিকার বাবার ও খারিজীদের বিদ্রোহ দমন

মালাসীয় দুর্গ পুনরুদ্ধার

অন্যান্য বিদ্রোহ

রাজ্য বিস্তার

তাবারিস্তান, গীলান ও দায়লাম জয়

এশিয়া মাইনরে রাজ্য বিস্তার

স্পেন জয়ের ব্যার্থ চেষ্টা

আল-মনসুরের চরিত্র

আল-মনসুরের কৃতিত্ব

সার-সংক্ষেপ

প্রশ্ন : আবু জা’ফর মনসুরকে আব্বাসী বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন? তাঁর খিলাফতকাল উল্লেখযোগ্য ঘটনাসহ বর্ণনা কর। (২০০৮, ১০, ১৩, ১৭, ১৯)

প্রশ্ন : আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান ও তাঁর হত্যার কারণ বর্ণনা কর।

আবু জাফর আল-মনসুরের পরিচয়

  • নাম: আবু জাফর আল-মনসুর
  • জন্ম: ৭১৪ খিষ্টব্দে হুমাইমা, বিলাদ আল-শাম নামক স্থানে (বর্তমানে জর্ডান)
  • কুনিয়াত নাম: আবু-জাফর
  • প্রদত্ত নাম: আবদুল্লাহ
  • লাকাব: আল-মনসুর
  • পুরো নাম: আবু জাফর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-মনসুর
  • রাজবংশ: আব্বাসি
  • পিতা: মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আবদুল্লাহ 
  • মাতা: সাল্লামা উম্মে আবদুল্লাহ
  • স্ত্রী: (১)আরওয়া বিনতে মনসুর আল-হিমিয়ারি (উম্ম মুসা), 
  •       (২)হাম্মাদাহ বিনতে ঈসা, 
  •       (৩)ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল-তাইমি.
  • সন্তান: (১) আরওয়া বিনতে মনসুর আল-হিমিয়ারি তার দুই পুত্র ছিল, মুহাম্মদ (আল-মাহদি) এবং জাফর. (৩) ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ আল-তাইমি তার তিন পুত্র ছিল সুলায়মান, ঈসা এবং ইয়াকুব.
  • (..) আল-মাসনুরের একমাত্র কন্যা ছিল আলিয়া.
  • ধর্ম: সুন্নি ইসলাম
  • মৃত্যু: ৬ অক্টোবর ৭৭৫ (৬১ বছর বয়সে) মৃত্যু হয় মক্কার কাছে আল-মা’লাত নামক স্থানে (বর্তমানে সৌদি আরব).
  • পূর্বসূরী: আল-সাফ্ফাহ,
  • উত্তরসূরী: আল-মাহদী,

আল-মনসুরের স্ত্রী ও সন্তান

আল-মনসুরের প্রথম স্ত্রী আরওয়া ছিলেন উম্মে মুসা, যার বংশ হিময়ার রাজাদের কাছে ফিরে গিয়েছিল। তার পিতা ছিলেন মনসুর আল-হিমিয়ারি। ইয়াজিদ নামে তার এক ভাই ছিল। তার দুই পুত্র ছিল, মুহাম্মদ (ভবিষ্যত খলিফা আল-মাহদি) এবং জাফর।

তিনি ৭৬৪ সালে মারা যান। আরেক স্ত্রী ছিলেন হাম্মাদাহ। তার পিতা ছিলেন ঈসা আল-মনসুরের মামাদের একজন। আল-মনসুরের খিলাফতকালে তিনি মারা যান। আরেক স্ত্রী ছিলেন ফাতিমা।

তার পিতা ছিলেন মুহাম্মদ, তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহর বংশধরদের একজন। তার তিন পুত্র ছিল, সুলায়মান, ঈসা এবং ইয়াকুব। তার একজন উপপত্নী ছিলেন একজন কুর্দি মহিলা। তিনি আল-মনসুরের পুত্র জাফরের মা ছিলেন। আরেক উপপত্নী ছিলেন কালি-আল ফাররাশাহ। তিনি একজন গ্রীক ছিলেন এবং আল-মনসুরের পুত্র সালিহ আল-মিসকিনের মা ছিলেন।

আরেক উপপত্নী ছিলেন উম্ম আল-কাসিম, যার ছেলে আল কাসিম দশ বছর বয়সে মারা যান। আল-মাসনুরের একমাত্র কন্যা আলিয়া একজন উমাইয়া মহিলার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসহাক ইবনে সুলায়মানকে বিয়ে করেন।

সিংহাসনারোহণ

আস্-সাফ্ফাহ্র মৃত্যুর সময় তাঁর ভ্রাতা আবু জাফর হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ঈসা তাঁকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং কুফায় ফিরে এসে আবু জাফর ‘আল-মনসুর’ উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সাথে সাথে আব্বাসীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আল-মনসুর

আবুল আব্বাস আস্‌-সাফফাহ ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। এ সময় আবু জাফর হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় ছিলেন। এ কারণে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর মৃত্যুর পর তাঁর ভাতিজা ঈসা তাঁর অনুপস্থিতিতে আবু জাফরের নামে শপথ বাক্য পাঠ করেন। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে আবু জাফর হজ্জ শেষে দ্রুত ফিরে আসেন। এ সময় তিনি মসজিদ প্রান্তরে প্রথম ভাষণ প্রদান করেন।

আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ আব্বাসীয় বংশের প্রথম শাসক। তিনি আব্বাসীয় আন্দোলনে ক্ষমতা লাভ করেও একক কৃতিত্ব লাভে সক্ষম হননি। সময় স্বল্পতার কারণে আসাফফাহর পক্ষে আব্বাসীয় খিলাফতকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় খলিফা আল মনসুর দূরদর্শীতা ও কূটনীতির দ্বারা অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবেলা করে আব্বাসীয় ফিলাফতকে সুদৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। আমীর আলী যথার্থই বলেছেন, “এ রাজ পরিবারের খলিফাগণের অপ্রতিহত ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রাধানা লোপের পরও ইহাদের প্রভূত প্রতিপত্তি তাঁরই দূরদর্শীতার গুণে সম্ভব হয়েছিল।” একারণেই আল মনসুরকে আব্বাসীয় খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

আল-মনসুরের শাসনকাল

আল-মনসুরের শাসনকালকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা : (১) বিদ্রোহ দমন, (২) রাজ্যবিস্তার ও (৩) প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংগঠন।

আব্দুল্লাহ-বিন-আলীর বিদ্রোহ

খলিফা হিসেবে আল-মনসুরের ক্ষমতা গ্রহণের পরেই আবদুল্লাহ্ বিন আলী সর্বাগ্রে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন সিরিয়ার শাসনকর্তা ও আল মনসুরের পিতৃব্য। পূর্ববর্তী খলিফা আস-সাফ্ফাহর রাজত্বকালে আবদুল্লাহ বিন আলী মারওয়ানের বিরুদ্ধে জাবের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কথা ছিল, যুদ্ধে জয়ী হলে আস্-সাফফাহ্ তাঁকে খিলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন।

কিন্তু পরে আস্‌-সাফফাহ্ তাকে সিরিয়ার শাসনকর্তার পদে নিয়োগ করেন। খলিফা তাঁর ওয়াদা খেলাপ করে আল-মানসুরকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে আস- সাফ্ফাহ্ প্রাণত্যাগ করলে তদস্থলে আল-মনসুর খিলাফতে অধিষ্ঠিত হন। খিলাফত হতে বঞ্চিত হওয়ায় আদুল্লাহ-বিন-আলী আল-মনসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

নাসিবিনের যুদ্ধ, ৭৫৪ খ্রি.

আবদুল্লাহর বিদ্রোহ দমনের জন্য খলিফা আবু মুসলিমকে প্রেরণ করেন। ১৭ হাজার সৈন্য নিয়ে আবদুল্লাহ্ প্রতিপক্ষের মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হলেন। নাসিবিন প্রান্তরে উভয় দলে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হলো (নভেম্বর, ৭৫৪ খ্রি.)। যুদ্ধে আবদুল্লাহ্ শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে পারলেন না।

আবদুল্লাহর পরাজয় ও মৃত্যু

আত্মরক্ষার জন্য তিনি তাঁর ভ্রাতা ও বসরার শাসনকর্তা সুলায়মানের কাছে পলায়ন করেন। সুলায়মানের ক্ষমতাচ্যুতির পূর্ব পর্যন্ত তিনি এখানেই ছিলেন। পরে খলিফা মনসুর তাঁকে ও তাঁর পুত্রকে বন্দী করেন। আবদুল্লাহ্-বিন-আলী সাত বছর কারাবাসের পর গৃহচাপা পড়ে প্রাণত্যাগ করেন। তাঁর এ মৃত্যুর পশ্চাতে আল-মনসুরের হাত ছিল। আবদুল্লাহ্র মৃত্যুতে খলিফা আল-মনসুর একজন শক্তিমান প্রতিদ্বন্দ্বীর হাত হতে রক্ষা পেলেন।

আবু মুসলিমের পরিচয়

আবু মুসলিম ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত ইরানের অধিবাসী। প্রাথমিক জীবনে তিনি ইস্‌পাহানে কাটান। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী। তাঁর বক্তৃতায় শত্রু-মিত্র সবাই বিমোহিত হয়ে যেত। উমর ইবনে আব্দুল আযীযের খিলাফতকালে আবু মুসলিম হজ্জব্রত পালনের জন্য মক্কায় আগমন করেন। এ সময় আব্বাসীয় আন্দোলনের পূর্ব পুরুষ মুহাম্মদের সাথে তার সাক্ষাত হয়।

তিনি আবু মুসলিমের শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ ও দূরদর্শিতা দেখে তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে। নিজের কাছে রেখে দেন। মুহাম্মদ খিলাফতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আবু মুসলিম এর ব্যাপারে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন। পরে তিনি আব্বাসীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

আবু মুসলিম খোরাসান এলাকায় প্রথমে আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রচার কার্য শুরু করেন। তাঁর যাদুকরী বক্তৃতায় আলী, ফাতেমীয়, সুন্নী, মাওয়ালী, খারিজী প্রভৃতি দলমতের লোক সকল পার্থক্য ভুলে আবু মুসলিমের পতাকা তলে সমবেত হয়। এভাবে খোরাসান আব্বাসীয় আন্দোলনের শক্তিশালী ঘাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। তাঁর অসাধারণ সাহস, প্রতিভা ও যোগ্যতা বলে উমাইয়াদের পতন এবং আব্বাসীয়দের উত্থান সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব না পেলে আব্বাসীয়দের সাফল্য সহজ সাধ্য ছিল না।

তাঁর অপরিসীম ক্ষমতা, বিপুল জনপ্রিয়তা ও অসাধারণ গুণ-বৈশিষ্ট্যের জন্য খলিফা মনসুর তাঁকে বিপজ্জনক মনে করতেন। এজন্যই ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। আবু মুসলিম আব্বাসীয় যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। ঐতিহাসিক মুর বলেন, “মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্ক আবু মুসলিম তাঁর অসাধারণ ধীশক্তি কর্মতন্ত্রতা এবং বীরত্ব দ্বারা উমাইয়াদের ধ্বংসস্তূপের ওপর আব্বাসীয় বংশকে প্রতিষ্ঠিত করে ইসলামের ধ্যান-ধারণায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করেন।”

আবু মুসলিমকে দরবারে আমন্ত্রণ

আমীর আলী আরো মন্তব্য করেছেন যে, আবু মুসলিমের আচরণ দাম্ভিকতাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং খলিফার প্রতি তাঁর উক্তি সম্মানসূচক ছিল না। এ জন্য আবু মুসলিম যখন খোরাসানের পথে তখন খলিফা মনসুর তাঁকে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ করে পাঠালেন। কারণ খলিফা মনে করলেন যে, আবু মুসলিম একবার খোরাসানে পৌঁছলে তিনি তাঁর সাথে পেরে উঠতে পারবেন না।

আবু মুসলিম খলিফার কুমতলব বুঝতে পেরে তাঁর সাথে দেখা করতে অস্বীকার করলেন। প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে পেরে উঠতে পারবেন না বুঝতে পেরে তিনি যখন হুলওয়ানে পৌঁছলেন তখন খলিফার দূত প্রচুর আশ্বাসবাক্য ও নানা প্রলোভন দ্বারা আবু মুসলিমকে রাজদরবারে আসার জন্য অনুরোধ জানালেন।

আবু মুসলিমের হত্যা

অবশেষে তিনি খলিফার সাথে দেখা করতে গেলে তাকে রাজকীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানান হয় । কিন্তু পরের দিন সাক্ষাতের সময় খলিফা তাঁকে আবদুল্লাহ্ বিন-আলীর নিকট হতে প্রাপ্ত মুষ্ঠিত দ্রব্যের কথা জিজ্ঞাসা করেন এবং ইবনে কাথিরের হত্যার জন্য তাঁকে অভিযুক্ত করেন। অতঃপর রাগান্বিত খলিফা হাতে তালি দেয়ার সাথে সাথে পাঁচজন সশস্ত্র লোক আবু মুসলিমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে হত্যা করে।

এভাবে যে লোকটি এতদিন ধরে বিশ্বস্ততার সাথে আব্বাসীয় বংশের খেদমত করছিলেন তাঁর জীবনাবসান হলো। বাস্তবিকপক্ষে আবু মুসলিম সম্পর্কে খলিফা মনসুরের সন্দেহের কোন কারণ ছিল না। আবু মুসলিম নিঃসন্দেহে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন; কিন্তু তিনি তাঁর প্রভুদের প্রতি অবাধ্য হন নি।

আবু মুসলিমের কৃতিত্ব ও চরিত্র

ইসলামের ইতিহাসে আবু মুসলিম একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি। ইস্পাহানের এক নগণ্য পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও স্বীয় প্রতিভাবলে তিনি সাম্রাজ্যের একজন রাজসংস্থাপক (King-maker) হয়ে উঠেছিলেন। উমাইয়া বংশের পতন ঘটিয়ে আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন।

আব্বাসীয় বংশকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর দান ছিল অপরিসীম। ঐতিহাসিক উইলিয়ম মূর বলেন, “মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে তিনি তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, কর্মতৎপরতা ও রণনৈপুণ্য দ্বারা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে নিয়েছিলেন এবং উমাইয়া বংশের ধ্বংসস্তূপের উপর আব্বাসীয় বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”

আবু মুসলিম নানা গুণে বিভূষিত ছিলেন। তিনি একদিকে যেমন উদার ও অতিথিপরায়ণ ছিলেন, তেমনি অন্যদিকে নিষ্ঠুর ও নির্দয় ছিলেন। আরববাসী ও পারস্যের খোরাসানীদের দুর্বলতা সম্বন্ধে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। আবু মুসলিম পারস্যবাসীদের উপর এমন রহস্যময় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, তাদের অনেকেই তাঁকে ‘নবী’ বলে মনে করত; এমনকি, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ‘আল্লাহ’ হিসেবে উপাসনা করত। নানা গুণ থাকা সত্ত্বেও খোরাসানে আবু মুসলিমের অপরিসীম ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত তাঁর কাল হয়ে দাঁড়ালো।

সানবাদের বিদ্রোহ

আবু মুসলিমের হত্যার পর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। পারস্য ও মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ সাংঘাতিক রূপধারণ করে। পারস্যের নেতা সানবাদ নিজেকে আবু মুসলিমের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজকীয় বাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে এ বিদ্রোহী নেতা পরাজিত ও নিহত হন। আবু মুসলিম খোরাসান ত্যাগের পূর্বে আবু নাসের নামক জনৈক বিশ্বস্ত অনুচরের উপর হুলওয়ানের শাসনভার অর্পণ করেছিলেন। আবু মুসলিমের পতন ঘটলে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। এতে খলিফা নিশ্চিত হলেন এবং খোরাসানে তাঁর কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।

রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ

৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে রাওয়ান্দিয়া নামে এক পারসিক সম্প্রদায় খলিফাকে আল্লাহর সমতুল্য জ্ঞান করে এবং তিনি আল্লাহ্র নামে তাদেরকে খাদ্য যোগান বলে প্রচার করে। তাদের কার্যকলাপে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা বিরক্তিবোধ করে। মনসুর তাদেরকে এরূপ প্রচারকার্য হতে বিরত থাকতে বললে তারা বিদ্রোহী হয়।

তিনি বিদ্রোহীদেরকে কঠোর হস্তে দমন করেন। এর কিছুদিন পর রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়ের ৬০০ লোক একদিন খলিফার দর্শনপ্রার্থী হয়। খলিফা তাদের দর্শন দিলে, তারা হঠাৎ তাঁকে আক্রমণ করে। মারওয়ানের বংশধর মায়ান-বিন যায়েদের হস্তক্ষেপের ফলে খলিফার প্রাণ রক্ষা পায়।

“বীরত্বপূর্ণ কার্যের জন্য খলিফা মায়ানকে ‘সিংহপুরুষ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁকে ইয়ামামা ও পরে সিজিস্তানের শাসনভার দেয়া হয়। এ ঘটনা উমাইয়াদের প্রতি খলিফার মনোভাবকে অনেকাংশে নমনীয় করেছিল। খলিফা রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে অনৈসলামিক কার্যকলাপের অভিযোগে শহর হতে বহিষ্কার করেছিলেন। এ ঘটনার কিছুদিন পর খোরাসানের শাসনকর্তা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। খলিফা তাঁর সেনাপতি ইবনে খোজাইয়া ও পুত্র আল-মেহদীকে বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাঠান। তাঁরা খোরাসানে উপস্থিত হলে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং নিজেদের লোক কর্তৃক বিদ্রোহী নেতার মস্তক দ্বিখণ্ডিত হয়।

আলী সম্প্রদায়ের দমন

আব্বাসীয়দের পক্ষে শক্তিশালী জনমত গঠন এবং এ বংশকে শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে আলী সম্প্রদায়ের (হযরত আলী ও ফাতেমার বংশধরগণ) ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। উমাইয়াদের রাজত্বের শেষভাগে আববাসীয় আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য মদিনায় একটি সভা ডাকা হয়েছিল। আল-মনসুর ও বানু হাশিমের অধিকাংশ লোক এ সভায় হাজির ছিলেন।

আব্বাসীয়দের পক্ষে আলী সম্প্রদায়ের কার্যাবলি স্বীকৃতিস্বরূপ এ সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়রা কৌশলে খিলাফতকে করায়ত্ত করবেন। এতে মুহাম্মদ কিংবা ইমাম হাসানের বংশধরের কোন অভিযোগ ছিল না। তাঁরা শাসনক্ষমতা ভোগের চেয়ে ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শনের চর্চায় বেশি আগ্রহী ছিলেন।

মুহাম্মদকে খিলাফত দানের প্রতিশ্রুতি

মক্কা, মদিনাসহ মুসলিম জনগণ তাঁদের বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। আব্বাসীয়গণ কর্তৃক মুহাম্মদকে খিলাফত প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে আল-মনসুর বিস্মৃত হন নি। সিংহাসনে আরোহণের পর তাই তিনি মুহাম্মদকে ভবিষ্যৎ বিপদের কারণ হিসেবে গণ্য করলেন। সিংহাসনকে নিষ্কন্টক করার জন্য তিনি মুহাম্মদকে বিনাশ ও আলী সম্প্রদায়কে দুর্বল করার জন্য উপায় খুঁজতে থাকেন। প্রথমে তিনি মুহাম্মদ ও তাঁর ভ্রাতা ইব্রাহীমকে খিলাফতের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন।

তাঁদেরকে দমনের জন্য এটা একটি অজুহাত ছিল মাত্র। কিন্তু এতে কোন ফল হলো না। তারা কেউই খলিফার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে সম্মত হলেন না। এ কূটকৌশল ব্যর্থ হলে আল-মনসুর অন্য পথ ধরলেন। মুহাম্মদ ও ইব্রাহীমকে বিদ্রোহী কার্যকলাপের অভিযোগে বন্দী করার জন্য মদিনার শাসনকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হলো।

উত্তর আফ্রিকার বাবার ও খারিজীদের বিদ্রোহ দমন

আব্বাসীয় শাসনামলের গোড়া হতেই উত্তর আফ্রিকার বাধার ও ধারিজীরা অশান্তি দৃষ্টি করে আসছিল। এতদঞ্চলে আব্বাসীয় বংশের শাসন সুপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা এক বিরাট হুমকি ছিল। খলিফা এ এলাকার বাবার ও খারিজীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান প্রেরণ করেছিলেন; কিন্তু এসব অভিযান তেমন কার্যকর হয় নি।

বিদ্রোহীদের কার্যকলাপ পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেলে খলিফা ইয়াযিদ ইবনে হাসান মুহাব্বাবের নেতৃত্বে একটি বিরাট সোনবাহিনী প্রেরণ করেন (৭৭২ খ্রিঃ)। ইয়াযিদ সাফল্যের সাথে কায়রোয়ান দখল করে বিদ্রোহীদের চরমভাবে পর্যুদস্ত করেন। আব্বাসীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে ইয়াযিদ এতদঞ্চলের শাসনভার লাভ করেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত (৭৮৭ খ্রিঃ) তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।

মালাসীয় দুর্গ পুনরুদ্ধার

খলিফা যখন অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমনে ব্যস্ত ছিলেন, রোমান বাহিনী তখন সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে উপদ্রব সৃষ্টি করে মালাসীয় দুর্গ দখল করে। ৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা রোমান সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। চতুর্থ কনস্টানটাইন পরাজিত হন এবং বার্ষিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার জন্য খলিফা গ্রিক সীমান্তে অনেক নতুন দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন।

অন্যান্য বিদ্রোহ

৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে হিরাতের শাসনকর্তা উস্তাদসীস (Ustadsis) বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এমনকি, তিনি নিজেকে দধী হিসেবেও দাবি করেছিলেন ? খোরাসান ও সিজিস্তানের বিরাট এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে আসে। বিদ্রোহীরা এত বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন যে, খলিফার সেনাবাহিনী বেশ কয়েকবার তাদের কাছে পরাজিত হয়। শেষ পর্যন্ত ইবনে খোজাইমার নেতৃত্বে এ বিদ্রোহ দমন করা হয়। বিদ্রোহী নেতা উস্তাদসীসকে বন্দী করে বাগদাদে আনা হয়। কথিত আছে, তাঁর কন্যাকে হারুনের সাথে বিবাহ দেয়া হয়, মামুন এ মহিলারই গর্ভজাত সন্তান।

রাজ্য বিস্তার 

তিনি সকল বিদ্রোহ এবং প্রতিপক্ষকে দমন করে সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর নতুন রাজ্য বিজয়ের পরিকল্পনা করেন। ৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে মনসুর সালেহ ও আব্বাসের নেতৃত্বে ৭০ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী রোমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে রোমান সম্রাট চতুর্থ কনস্টানটাইন পরাজিত হয়ে মনসুরকে বার্ষিক কর দানে বাধ্য হন। তারপর তিনি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে তাবারিস্তান ও গীলান অধিকার করেন।

এছাড়া তিনি খালিদ ইবনে বার্মাকের নেতৃত্বে এশিয়া মাইনরের উপজাতীয়দের বিদ্রোহ দমন করেন। মনসুর স্পেন জয় করতে না পারলেও উত্তর আফ্রিকা বিজয়ে সক্ষম হন। তিনি জর্জিয়া, মসুল, আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তান সাম্রাজ্যের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন। মনসুর মালাসিয়া দুর্গটি পুনরুদ্ধার করেন। তিনি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য গ্রিস সীমান্তে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। মোটকথা তিনি স্পেন ও আফ্রিকার কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সমগ্র আরব সাম্রাজ্য আব্বাসীয় শাসনাধীনে নিয়ে আসেন।

তাবারিস্তান, গীলান ও দায়লাম জয়

অভ্যন্তরীণ অবস্থা আয়ত্তাধীনে এনে মনসুর বহিঃশত্রুর প্রতি দৃষ্টি দেন। তাবারিস্তানের পার্বত্য অধিবাসীরা ইস্পাহেন্দের নেতৃত্বে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমান্তে নানাপ্রকার অত্যাচার করত। খলিফা তাঁর পুত্র মাহদীর নেতৃত্বে এসব লোককে কঠোরভাবে দমন করেন এবং তাদের অধ্যুষিত তাবারিস্তান ও গীলান মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেন। এরপর মাহদী প্রতিবেশী দায়লামের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং সেখানকার বিদ্রোহ দমন করে একে সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। খলিফা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দায়লামে একটি যুদ্ধঘাঁটি নির্মাণ করেন।

এশিয়া মাইনরে রাজ্য বিস্তার

কুর্দীস্তানের কুর্দ ও এশিয়া মাইনরের জর্জিয়া, মসুল প্রভৃতি অঞ্চলের উপজাতিরা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। খলিফা তাদেরকে দমনের জন্য খালিদ-বিন-বার্মাককে সেখানকার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। এ নতুন শাসনকর্তার প্রচেষ্টায় এতদঞ্চলে আব্বাসীয় শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

স্পেন জয়ের ব্যার্থ চেষ্টা

আল-মনসুরের শাসনামলের প্রথম দিকেই স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ শাসন কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবদুর রহমান নামক হিশামের জনৈক পৌত্র। দামেশকে উমাইয়া খিলাফতের পতন ঘটলে আবদুর রহমান আব্বাসীয় খলিফা আস-সাফ্ফাহর কবল হতে কোনক্রমে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হন এবং স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিনি যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন।

খলিফার নির্দেশে উত্তর আফ্রিকার শাসনকর্তা স্পেনের বিরুদ্ধে অভিযানের নেতৃত দেন। আবদুর রহমান এ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হন নি, আব্বাসীয় সেনাপতির ছিন্নমুণ্ডও খলিফার নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

আবদুর রহমানের এ ঔদ্ধত্যে খলিফা আল-মনসুর বিস্মিত হন। এবং আবদুর রহমানকে ‘কুরাইশদের বাজপাখি’ (Falcon of the Quraysh) নামে অভিহিত করেন। খলিফা পরবর্তী সময়ে স্পেনের বিরুদ্ধে আর কোন অভিযান প্রেরণ করেন নি। স্পেন ও আফ্রিকার কিয়দংশ ব্যতীত প্রায় সমগ্র আরব সাম্রাজ্যে আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠা : আলী সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ দমনের পর খলিফা আল-মনসুর একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি একটি উপযুক্ত স্থানে একটি শক্তিশালী রাজধানী স্থাপনের সচেষ্ট হন। তিনি খলিফা আল-আব্বাসের প্রতিষ্ঠিত রাজধানীকে (হাশিমীয়া শহর) সাম্রাজ্যের রাজধানীর জন্য নিরাপদ মনে করেননি।

কারণ এ শহর সিরিয়া ও কুফার মধ্যস্থানে অবস্থিত ছিল। ফলে আলী সম্প্রদায়ের আক্রমণের আশঙ্কা হতে এটা নিরাপদ ছিল না। রাজধানী হিসেবে দামেশ্বকও নিরাপদ ছিল না।

কারণ, এখানকার অধিবাসী ছিল উমাইয়া ভাবাপন্ন। নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠার জন্য অবশেষে খলিফা পারস্যের প্রাচীন সম্রাটের গ্রিশ্বাবাস (Summer residence) বাগদাদকে উপযুক্ত বলে নির্ধারণ করেন। এ স্থান ছিল প্রাচীন রাজধানী মাদায়েন নগরের পনেরো মাইল উত্তরে দজলা (টাইগ্রীস) নদীর পশ্চিম তীরে। এর অবস্থান ছিল সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানে। নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

এ রাজধানীর সাথে নৌপথে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া সহ অন্যান্য অঞ্চল, এমনকি সুদূর চীনের সাথেও সহজ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল। এতে আন্ত ও বহির্বাণিজ্য প্রসারের সম্ভাবনাও ছিল প্রচুর। এতদ্ব্যতীত এ স্থানের আবহাওয়া ছিল স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশ ছিল মনোমুগ্ধকর।

সৌন্দর্যমণ্ডিত বাগদাদ নগরী : খলিফা আল-মনসুর বাগদাদকে রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করে এর নতুন নামকরণ করেন দার-উস-সালাম‘, অর্থাৎ শান্তিধাম। খলিফা আল-মনসুরের নামানুসারে এর আর এক নাম ছিল মনসুরিয়া‘। বাগদাদকে রাজধানী নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া প্রভৃতি অঞ্চল হতে আগত প্রায় এক লাখ শ্রমিক, কারিগর ও শিল্পী ৭৬২ খ্রিস্টাব্দ হতে ৭৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পরিশ্রম করেন।

এ রাজধানীর প্রাথমিক নির্মাণকার্য সম্পন্ন করতে ব্যয় হয় প্রায় ৫ লাখ দিরহাম। রাজধানীর নগরীকে সুরক্ষিত করার জন্য গোলাকার প্রাচীর বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছিল রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে ছিল খলিফা মনসুরের রাজপ্রাসাদ, জামে মসজিদ ও শীর্ষস্থানীয় রাজকর্মচারীদের বাসস্থান।

বাগদাদের গুরুত্ব : শোভা বর্ধনের জন্য নির্মিত হয়েছিল কৃত্রিম ফোয়ারা, সুসজ্জিত তোরণ, নয়নাভিরাম বাগিছা, প্রশস্ত রাজপথ প্রভৃতি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা ছিল। নগর-প্রাচীরের বাইরে বাজার বসত। অল্পকালের মধ্যে বাগদাদ জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগরীতে পরিণত হয় এবং মধ্যযুগীয় শিক্ষা ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

পরবর্তীকালে বাগদাদ রূপকথার ঐশ্বর্যময়ী নগরীতে পরিণত হয় এবং তৎকালীন দুনিয়ার বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। বাগদাদকে কেন্দ্র করে মুসলিম মনীষীর যে বিকাশ ঘটে, বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা সংস্কৃতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিসীম।

আল-মনসুরের শাসন ব্যবস্থা

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে তিনি সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

নিয়মিত সৈন্যবাহিনী গঠন : তিনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে দেশকে রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃখলার জন্য শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। তিনি সৈনিকদের উপযুক্ত বেতনের ব্যবস্থা করেন। 

গোয়েন্দা বাহিনী গঠন : তিনি চেয়েছিলেন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করতে। দেশের ভেতরে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দুর্নীতি দমন করার জন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র অচর নিয়োগ করেন। গুপ্তচরদের থেকে খলিফা প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন।

প্রদেশের সীমানা পুনঃনির্ধারণ এবং শাসকদের বদলীর ব্যবস্থা : বিশাল সাম্রাজ্যকে খলিফার একার পক্ষে শাসন করা সম্ভব ছিল না। সেজন্য তিনি পুনরায় প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করেন। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের উপর এর শাসন কার্যের দায়িত্ব অর্পণ করেন। সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা এবং জনস্বার্থে গভর্নর ও কর্মচারীদের বদলী করতেন।

ন্যায়বিচার প্রবর্তন : তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে ন্যায়বিচার প্রবর্তনের জন্য কাজী নিয়োগ করতেন। কাজীগণ আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তাঁরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ছিলেন। মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিশ বছর যাবত বাগদাদের কাজী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।

কাজীর বিচার শোনার জন্য মাঝে মাঝে সুলতান সাধারণ দর্শকের মত বসে রায় শুনতেন, কাজী একবারও বিচারকার্য চলার সময় দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান করতেন না।

শিক্ষা সংস্কার : তিনি একজন শিক্ষা ও জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আব্বাসীয় খিলাফত শিক্ষা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে কৃতিত্ব অর্জন করে, তার প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন খলিফা আল-মনসুর। তিনি রাজ্যে অনেক মসজিদ, মক্তব ও মাদরাসা স্থাপন করেন। শিক্ষকদের যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। তাছাড়া তিনি নিজেও একজন গণিত ও বিজ্ঞান শাস্ত্রের পণ্ডিত হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

জনকল্যাণ : জনগণের কল্যাণের জন্য খলিফা আল-মনসুর অনেক নগর, সরাইখানা, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সময়ে কৃষিকাজের ব্যাপক উন্নতি হয়। ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

আল-মনসুরের চরিত্র

মনসুরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সুন্দর, নির্মল ও পবিত্র। তিনি ছিলেন একদিকে ন্যায়পরায়ণ, ধার্মিক, পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল, দূরদর্শী এবং জনদরদী। তিনি তাঁর বন্ধুদের প্রতি ছিলেন খুবই কোমল আর শত্রুদের প্রতি ছিলেন কঠোর ও নির্মম।

তাঁর চরিত্রে ছিল দোষ ও গুণের অপূর্ব সংমিশ্রণ। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, কোমল ও আদর্শ স্থানীয়। কোন রকম পাপ-পঙ্কিলতা তাঁর চরিত্রকে কলুষিত করতে পারেনি। তাঁর দরবারে অধর্মাচরণের কোন স্থান ছিল না। ন্যায়নিষ্ঠা, মিতব্যয়িতা, কর্মতৎপরতা ও প্রজাসাধারণের প্রতি দরদী মন তাঁকে সদা কর্মচঞ্চল করে রাখত।

মৃত্যুর সময় মনসুর নিজপুত্র আল-মাহদীকে যে শেষ উপদেশ দিয়ে যান- তা তাঁর অভিজ্ঞতা, মহান চরিত্র ও উন্নত শাসন দক্ষতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেন- “যা আজ করতে হবে, তা আগামী কালের জন্য ফেলে রেখো না। জনসাধারণ ও সেনাবাহিনীকে খুশি রেখো। তোমার ধনাগার কখনও শূন্য রেখো না। তোমার কর্তব্য কাজ নিজেই সম্পাদন কর।

তোমার বন্ধুবর্গ ও আয়-স্বজনকে কখনও অবহেলা করো না। ধর্মপরায়ণতা ছাড়া আর কিছুই খলিফাকে গুণবান করে না। কর্তব্যপরায়ণতা ব্যতিরেকে আর কিছুই খলিফার শোভা পায় না। ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া জনসাধারণের সংস্কার সাধন করা যায় না।…… সম্যক চিন্তা না করে কোন কাজে অগ্রসর হয়ো না। কৃতজ্ঞতা দ্বারা বদান্যতা, ক্ষমা দ্বারা ক্ষমতা, মনোহরী স্নেহ দ্বারা বাধ্যতা এবং বিনয় ও তিতিক্ষা দ্বারা বিজয় অক্ষুণ্ণ রাখবে।”

তাঁর চরিত্রে কোমলতার পাশাপাশি নিষ্ঠুরতাও ছিল। নিজের বংশকে খিলাফতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি সম্ভাব্য সকল শত্রুকে সমূলে বিনাশ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না। তিনি আলী বংশীয়দের, আবু মুসলিম খোরাসানী এবং আবদুল্লাহ বিন আলীর প্রতি যে নৃশংস ব্যবহার করেন তার তুলনা দুনিয়াতে বিরল।

ছলে বলে ও কৌশলে ঈসাকেও তিনি সিংহাসনের দাবি থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করেন। তাঁর চরিত্রে নিষ্ঠুরতা না থাকলে তিনি হয়ত আব্বাসীয় খিলাফতকে সুদৃঢ় করতে পারতেন না ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয়, স্বার্থ-তাঁর কাছে বড় ছিল। তাই আব্বাসীয় শাসনকে দৃঢ় করার জন্য তাঁকে কঠোরতা অবলম্বন করতে হয়েছে। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন- নিষ্ঠুর, স্বার্থপর এবং অবিবেচক মনসুর নিজের অথবা বংশের স্বার্থে বিপজ্জনক মনে করলে কাউকে রেহাই দিতেন না।”

ইমাম জাফর আস সাদেক, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালিকের প্রতি তাঁর নিষ্ঠুর ব্যবহার মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি ও হৃদয়কে ব্যথিত করেছে।

আল-মনসুরের কৃতিত্ব

আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত স্থপতি : আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস্-সাফফাহ হলেও তিনি সময়ের অভাবে তাঁর বংশকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারেননি। খলিফা মনসুর সুদৃঢ় হাতে বিদ্রোহ দমন করে। সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃক্সখলা ও সংহতি ফিরিয়ে আনেন। সাম্রাজ্য বিস্তার, সার্বভৌমত্বের সম্প্রসারণ, সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা দ্বারা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা বিধান করেন।

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা-দীক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা সভ্যতার উল্লেখ সাধন করে আব্বাসীয় খিলাফতকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। এ সব দিক বিবেচনা করে খলিফা আল-মনসুরকে আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও শাসক হিসেবে খলিফা মনসুর ছিলেন সে যুগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সর্বশ্রেষ্ঠ। খলিফা জানতেন একদিন না একদিন আব্বাসীয় বংশের পতন হবে। কাজেই তিনি তাঁর বংশের স্থায়িত্বের জন্য খলিফার পার্থিব ক্ষমতার সাথে জনতার আধ্যারি নেতৃত্বের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার সুন্নী মতবাদ রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়। তাঁর উৎসাহে হানাফী ও মালিকী মাযহাব গড়ে উঠে।

ন্যায় বিচার : আল-মনসুর ছিলেন ন্যায়বান শাসক। তাঁর ন্যায়বিচার ও ন্যায়দর্শিতা ছিল প্রশংসনীয়। একবার কয়েকজন উটের মালিকের অভিযোগে মদীনার কাজী খলিফা মনসুরকে তাঁর বিচারালয়ে হাজির হতে বলেন। মনসুর বিনা দ্বিধায় কারীর বিচারালয়ে উপস্থিত হয়ে সাধারণ আসামীদের ন্যায় কাজীর সামনে দাঁড়ান। বিচারে মনসুর দোষী সাবাস্ত হয়। মনসুর কাজীর সৎসাহসের জন্য ধন্যবাদ জানান ও তাঁকে প্রচুর অর্থ দ্বারা পুরস্কৃত করেন।

শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠাতা ও আবুল আব্বাসের মৃত্যুর সাথে সাথে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। আবুল আব্বাসের নিষ্ঠুরতার জন্য লোকজন আব্বাসীয়দের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। মনসুর এসে সকল অসন্তোষ দূর করে আব্বাসীয় বংশের নিরাপত্তা এবং সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

দৈনন্দিন কর্মসূচি : খলিফা মনসুর সুদীর্ঘ ২২ বছর খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তিনি কোন রকম অবহেলা করতেন না, নিয়মিতভাবে তিনি রাজকার্য তদারক করতেন। সকালের দিকে তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের খবরাদি জানতেন এবং প্রয়োজনীয় আদেশ-নিষেধ জারি করতেন। রাজকার্যের প্রত্যেকটি বিষয় তিনি স্বয়ং দেখাশুনা করতেন। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়কদের হিসাব-নিকাশ তিনি কড়াকড়িভাবে তদারক করতেন। এমনকি দিরহামের কানাকড়ি পরীক্ষা করে দেখতেন, এজন্য তাঁকে ‘আদ্দাওয়ানিকী’ উপাধি দেয়া হয়েছিল।

বিজেতা হিসেবে : অভ্যন্তরীণ সংহতি ও শৃক্মখলা এনে খলিফা মনসুর রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন। তিনি রোমান সম্রাট চতুর্থ কনস্টানটাইনকে ৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে পরাজিত করে মালাসিয় দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। তিনি গ্রিক সীমান্তে নতুন দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি তাবারিস্তান, আর্মেনিয়া, কুর্দিস্তান ও উত্তর আফ্রিকা জয় করে তাঁর শাসনাধীনে নিয়ে আসেন।

জনসাধারণের কল্যাণ সাধন খলিফা মনসুর জনসাধারণের হিতৈষী বন্ধু ছিলেন। জনসাধারণের কল্যাণের জন্য বহু নগর, সরাইখানা, চিকিৎসালয়, রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন।

সুন্নী মতবাদের পৃষ্ঠপোষক : খলিফা মনসুর ছিলেন দূরদর্শী বিদ্বান এবং ধর্মপরায়ণ। তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে ধর্মীয় নেতৃত্বের সংযোগ স্থাপন করেন। এতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টিতে খিলাফতের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তিনি সুন্নী মতাদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেন।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক : খলিফা মনসুরের সময় হতে মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে সোনালী যুগের সূচনা হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করে মুসলমানগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে চরম উৎকর্ষ লাভ করে এর তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাঁর সময়ে সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, চিকিৎসা, দর্শন ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের গভীর চর্চা শুরু হয়। তাঁর আদেশে গ্রিক ও ভারতীয় পণ্ডিতদের দুগ্রাপ্য গ্রন্থাবলী অনুদিত হয়। মনসুরের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান পণ্ডিতগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটান।

স্থাপত্য শিল্পের পৃষ্ঠপোষক : খলিফা মনসুরের খিলাফত মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের উন্মেষ ঘটে। মধ্যযুগের বিশ্বসভ্যতার চারণভূমি সৌন্দর্যের নগরী বাগদাদ প্রতিষ্ঠা তাঁর অমর কীর্তি। তা ছাড়া কৃষ্ণা ও বসরা নগরীর প্রাচীর, রুসাফা নামক রাজপ্রাসাদ তাঁর উন্নত শিল্প মনের পরিচয় বহন করে।

সার-সংক্ষেপ

উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আবুল আব্বাস ও আবু মুসলিমের নেতৃত্বে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। আবুল আব্বাস আস সাফফাহ আব্বাসীয়দের প্রথম শাসক হলেও সময়ের স্বল্পতার কারণে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব রেখে যেতে পারেননি। খলিফা আল-মনসুর সে অভাব পুরন করেন। প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যে সব কাজ করা দরকার আল মানুসর তা সবই করেছেন। এজন্য তাঁকে আব্বাসীয় খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

তিনি নিজ বংশকে ক্ষমতায় টিকে রাখার জন্য সম্ভব্য সকল শত্রুকে বিনাশ করেন। তিনি সকল বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেন। আব্বাসীয় শাসন দৃঢ়ীকরণে তিনি প্রথমত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে সামাজ্যের সর্বত্র শান্তি স্থাপন ও রাজাকে সুসংহত করেন। দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করে শাসন ব্যবস্থায় শৃক্মখলা বিধান করেন।

প্রশ্ন : আবু জা’ফর মনসুরকে আব্বাসী বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন? তাঁর খিলাফতকাল উল্লেখযোগ্য ঘটনাসহ বর্ণনা কর। (২০০৮, ১০, ১৩, ১৭, ১৯)

উত্তর : আব্বাসী বংশের প্রথম খলীফা আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফার মৃত্যুর পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে ভ্রাতা আবু জা’ফর মনসুর খিলাফতের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সাথে সাথে আব্বাসীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফার নিষ্ঠুরতার কারণে দেশে বিভিন্ন প্রকার গোলযোগ ও স্থানে স্থানে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।

খলীফা আবু জা’ফর মনসুর খিলাফতের আসনে বসার পর অত্যন্ত দূরদর্শীতা ও বিচক্ষণতার সাথে বিদ্রোহগুলি দমন করেছিলেন এবং দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করে ভাবীকালের জন্য একটি সুদৃঢ়, সমৃদ্ধশালী ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। ফলে দীর্ঘ পাঁচশত বছর আব্বাসী খিলাফত পৃথিবীর বুকে স্থায়িত্ব লাভ করেছিল।

খলীফা আবু জাফর মনসুর দেশে ন্যায়-নিষ্ঠা কায়েম করেছিলেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। খিলাফতের সম্মান বৃদ্ধির জন্য সুন্নী ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার সাথে দেশীয় শাসনব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করেছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সকল জাতি ও ধর্মের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আব্বাসী খিলাফতের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

“তাই, খলীফা আবু জা’ফর মনসুরকে আব্বাসী বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা হয়। খলীফা আবুজাফর মনসুরের খিলাফতকালকে তিনভাগে ভাগ করা যায়, যথা – বিদ্রোহ দমন, প্রশাসনিক সংগঠন ও রাজ্য বিস্তার।

খলীফা হিসাবে আবু জা’ফর মনসুরের ক্ষমতা গ্রহণের পরেই খিলাফতের অন্যতম দাবিদার – পিতৃব্য আব্দুল্লাহর বিন্ আলী সর্বাগ্রে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

খলীফা আবু জাফর মনসুর আব্দুল্লাহ্ বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমন করেন। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে নাসিবিনের যুদ্ধে আব্দুল্লাহকে পরাস্ত করে, অতঃপর কারারুদ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করেন।

এটি তার যুগের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

খলীফা আবু জা’ফর মনসুর খোরাসানের খ্যাতনামা প্রবল প্রতাপশালী শাসক- আব্বাসী খিলাফতের কিং-মেকার আবু মুসলিম খোরাসানীকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেন। যা তাঁর শাসনামলের এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা। সানবাদের বিদ্রোহ, রাওয়াদিয়া সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন তাঁর খিলাফতের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব।

ইমাম মালিক, ইমাম জা’ফর সাদিক (রহ:) এর প্রতি অমানুষিক নির্যাতন এবং ইমাম আবু হানিফল (রহ:)কে বিনা অপরাধে কারারুদ্ধ করে হত্যা করা মনসুরের শাসনামলের একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। খলীফা আবু জা’ফর মনসুর বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশাসনিক ব্যবস্থা শক্তিশালী ও নিরাপদ করার জন্য বাগদাদে রাজধানী নির্মাণ করেন।

বাগদাদের জামে মসজিদ, বাবুল জাহাব, কাসরুল খুলদ, রাক্কার রাজপ্রাসাদা ও রফিকাহ নামক শহর তাঁর আমলের স্থাপত্য শিল্পের অনন্য স্মৃতি।

পুলিশবাহিনী গঠন, কাজির পদ বহাল, সুন্নী ধর্মমত প্রতিষ্ঠা, গুপ্তচর প্রথার প্রবর্তন, কর নির্ধারণ, জমি জরিপ ও আদম শুমারীর ব্যবস্থা গ্রহণ তাঁর যুগের উল্লেখযোগ্য বিষয়। শিল্প, সাহিত্য ও

জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা চিরস্মরণীয়। তিনি দেশে প্রভূত উন্নতি সাধন করে জনসাধারণের বিপুল সমর্থন লাভ করেছিলেন এবং প্রশাসনিক দিক দিয়ে জনগণকে সঙ্ঘবদ্ধ করেছিলেন।

খলীফা আবু জা’ফর মনসুর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় বাইশ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকালে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, প্যালেস্টাইন ও খোরাসান সহ কুর্নীস্তান, এশিয়া মাইনর, জর্জিয়া, মসুল, দামেশক প্রভৃতি রাজ্য, স্পেন ও আফ্রিকার কিয়দাংশ ব্যতীত সমগ্র আরব সাম্রাজ্যে আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে আরব জগৎকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করে আব্বাসীয় খিলাফতের ভিত্তিকে শক্ত করেছিলেন যেটি তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক সাফল্যময় ঘটনা।

প্রশ্ন : আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান ও তাঁর হত্যার কারণ বর্ণনা কর।

উত্তর :  আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আৰু মুসলিম খোরাসানীর অবদান: আবু মুসলিম খোরাসানী যার প্রকৃত নাম ইবরাহীম বিন উসমান। বাল্যকাল থেকেই তিনি আলী বংশের দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের তত্ত্বাবধানে খোরাসানে সর্বপ্রথম আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন পরিচালনা করেন। তখন ছিল উমাইয়া বংশের শাসনামল।

উমাইয়া শাসনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা ছিল, তাই তিনি উমাইয়া শাসনের অবশান ঘটিয়ে দেশে আব্বাসী শাসন কায়েম করার জন্য নেতৃত্ব দেন। ১৩০ হিজরিতে তিনি উমাইয়া শাসকদের পরাস্ত করে খোরাসান দখল করেন। ১৩২ হিজরিতে কুফায় কার্যরত হাশেমী বংশের নেতা আবু সালমাহকে পরাস্ত করে এবং বাসরার গভর্নরকে পরাজিত করে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেন।

আবু মুসলিমের দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের মৃত্যুর পর, যাতা আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ আফসাফ্‌ফাহ ১৩২ হিজরি মুতাবিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রশাসনিকভাবে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আব্বাসী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। এ-ব্যাপারে আবু মুসলিম খোরাসানীর যথেষ্ট সহযোগিতা ও অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল। উমাইয়া বংশকে নিপাত করে আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান অপরিসীম।

আবুল আব্বাস সাফ্ফার শাসনামলে খিলাফত-বিদ্রোহীদের বীরত্বের সহিত দমন করে আব্বাসী খিলাফতকে শক্তিশালী ও কণ্টকমুক্ত করেন।

আব্বাসী খিলাফতের দ্বিতীয় খলীফা আবু জা’ফর মনসুর খিলাফতির আসন গ্রহণ করলে – খিলাফতের অন্যতম দাবিদার সিরিয়ার শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ্ বিন আলী ওঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে নাসিবিনের যুদ্ধে আব্দুল্লাহ্ বিন আলীকে চরমভাবে পরাস্ত করে আবু মুসলিম এক অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন।

মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের আয়ুস্কালে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, রণনৈপুণ্যতা ও অসীম বীরত্বের দ্বারা তিনি দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেন।

হত্যার কারণ অর্থই অনর্থের মূল। অপরিসীম ক্ষমতা ও অধিক জনপ্রিয়তা অনেক সময় ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এইরূপ কারণ আবু মুসলিমদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। আবু মুসলিম পারস্যবাসীদের উপর রহস্যময় ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন খলীফা আবু জা’ফর মনসুরের মনে ভয় ও ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আবু মুসলিম খোরাসানী অগাধ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে লাগলেন; খলীফা আবু জাফরকে পরওয়া না করে নিজের ইচ্ছায় অনেক কাজ করতেন। আবু মুসলিম ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে আব্বাসীয় অন্যতম নেতা উসমান বিন কাসীরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেন। ফলে খলীফা মনসুর তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হন।

এইরূপে আবু মুসলিমদের ঔদ্ধতা, দাম্ভিকতা ও প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তি দেখে খলীফা মনসুর আশঙ্কা করেছিলেন যে, হয়তো সে অদুর ভবিষ্যতে আব্বাসীয় খিলাফত ছিনিয়ে নিতে পারে। তাই, এইরূপ সম্ভাব্য বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য খলীফা আবু জা’ফর মনসুর আবু মুসলিম খোরাসানীকে হত্যা করেছিলেন।

  • communication of barriers

    Type of Barriers Communication: Examples Definition and FAQs

  • কলের কলকাতা : সুভাষ মুখোপাধ্যায়,”আমার বাংলা”- bnginfo.com

    মেঘের গায়ে জলখানা : সুভাষ মুখোপাধ্যায়,”আমার বাংলা”- bnginfo.com

  • কলের কলকাতা : সুভাষ মুখোপাধ্যায়,”আমার বাংলা”

    কলের কলকাতা : সুভাষ মুখোপাধ্যায়,”আমার বাংলা”- bnginfo.com

  • 'ছাতির বদলে হাতি' সুভাষ মুখোপাধ্যায়

    ছাতির বদলে হাতি : সুভাষ মুখোপাধ্যায়,”আমার বাংলা”- bnginfo.com

June 2023
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

Leave a Reply