আস-সাফ্ফাহ  AS-SAFFAH | ১ম আব্বাসীয় খলিফা
আস-সাফ্ফাহ  AS-SAFFAH

আস-সাফ্ফাহ  AS-SAFFAH | ১ম আব্বাসীয় খলিফা

আবু আল-আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাফাহ সাধারণত আবু’ল আব্বাস ও তার লাকাব দ্বারা আস-সাফাহ নামে পরিচিত। ৭২১ খ্রিঃ হুমাইমা, বিলাদ আল-শাম নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমানে জর্ডান), ৭৫০ খ্রিঃ আস-সাফাহ আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্টা করে নিজেকে প্রথম আব্বাসীয় খলিফা বলে ঘোষণা করেন। সিংহাসনে আরোহন করার পরে উমাইয়াদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালান। নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জন্য তাকে ‘রক্ত পিপাসু (আস-সাফ্ফাহ) উপাধি দেয়া হয়। ৭৫০-৭৫৪ খ্রিঃ খিলাফত করে ১০ জুন ৭৫৪ (৩৩ বছর বয়সে) মৃত্যু হয় আল-আনবার নামক স্থানে (বর্তমানে ইরাক).

আবু আল-আব্বাস আস-সাফ্ফাহর পরিচয়

আব্বাসীয় বংশের বৈশিষ্ট্য

আব্বাসীয়দের আত্মপ্রকাশ 

আবুল আব্বাসের খিলাফত ঘোষণা ও আস-সাফফাহ উপাধি গ্রহণ

আবুল আব্বাসের চরিত্র ও কৃতিত্ব

উমাইয়াদের নৃশংসভাবে হত্যা করে আবুল আব্বাস ‘আস-সাফফাহ’

বিদ্রোহ দমন

প্রশাসনে আত্মীয় ও সমর্থকদের নিয়োগ

সিরিয়ার মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ 

রাজধানী পরিবর্তন

আবু সালমার হত্যা

আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর মৃত্যু ও উত্তরাধিকারী মনোনয়ন

সারসংক্ষেপ

আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান ও তাঁর হত্যার কারণ বর্ণনা কর।

আব্বাসীয় বংশের বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

আব্বাসী যুগের প্রথম খলীফা কে ছিলেন ? কিংবা, আবুল আব্বাস আসাফ্ফাহ্ কে ছিলেন ? আজ তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা দাও। (২০০৮, ১০, ১২,১৭,১৮,১৯)

আবু আল-আব্বাস আস-সাফ্ফাহর পরিচয়

  • নাম: আবু আল-আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আল-সাফ্ফাহ
  • জন্ম: ৭২১ খিষ্টব্দে হুমাইমা, বিলাদ আল-শাম নামক স্থানে (বর্তমানে জর্ডান)
  • কুনিয়াত নাম: আবুল-আব্বাস
  • প্রদত্ত নাম: আবদুল্লাহ
  • লাকাব: আস-সাফাহ
  • পুরো নাম: আবু আল-আব্বাস ‘আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-সাফাহ
  • রাজবংশ: আব্বাসি
  • পিতা: মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আবদুল্লাহ 
  • মাতা: রাইথ আল-হারিতিয়া
  • স্ত্রী: উম্মে সালামা বিনতে ইয়াকুব আল-মাখতুমী
  • সন্তান: রাইতাহ বিনতে আস-সাফাহ ও রায়তা বিনতে আল-সাফ্ফাহ
  • ভাই: আল-মনসুর
  • ধর্ম: সুন্নি ইসলাম
  • মৃত্যু: ১০ জুন ৭৫৪ (৩৩ বছর বয়সে) মৃত্যু হয় আল-আনবার নামক স্থানে (বর্তমানে ইরাক)
  • পূর্বসূরী: দ্বিতীয় মারওয়ান
  • উত্তরসূরী: আল মনসুর

আব্বাসীয় বংশের বৈশিষ্ট্য

আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (১১৩-৩৭ হিজরি; ৭৫০-৭৫৪ খ্রিঃ) আস-সাফফাহর ক্ষমতা লাভের সাথে সাথে আব্বাসীয় বংশের ইতিহাসে এক নতুন খিলাফতের সূচনা হয়। এ ঘটনাকে কেবল বংশগত শাসনের পালাবদল বলা যায় না। এটা ছিল প্রাথমিক ইসলামী যুগের একটি বৈপ্লবিক ঘটনা- যা ইসলামের পরবর্তী যুগের জীবনব্যবস্থা, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিল্পকলা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছিল। আব্বাসীয় শাসনের পরবর্তী সময়ের এসব পরিবর্তনশীলতার প্রকৃতি অনুধাবন করতে হলে সর্বাগ্রে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি এবং পূর্ববর্তী উমাইয়া খিলাফতের সাথে এর তুলনামূলক বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিপ্লবের স্বরূপ বর্ণনা করা দরকার।

আব্বাসীয়দের আত্মপ্রকাশ 

হাসান-বিন-কাহ্তাবের খোরাসানী সৈন্যরা কুফা দখল করার (৭৪৯ খ্রিঃ) পর আব্বাসীয় বংশের লোকেরা গোপন স্থান হতে বের হয়ে এসেছিল। ‘মুহাম্মদের উজির’ নামে পরিচিত এবং কুফাতে কার্যরত হাশিমীয় বংশের নেতা আবু সালমা আবুল আব্বাসকে আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা বলে ঘোষণা করেন। খোরাসানে আবু মুসলিমের বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করার জন্য আবুল আব্বাসের ভ্রাতা ও আব্বাসীয়দের ইমাম ইব্রাহীমকে উমাইয়া খলিফা মারওয়ান কর্তৃক প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাণদণ্ডাজ্ঞা লাভের পূর্বে ইব্রাহীম তাঁর ছোট ভাই আবুল আব্বাসকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান।

আবুল আব্বাসের খিলাফত ঘোষণা ও আস-সাফফাহ উপাধি গ্রহণ

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে আবুল আব্বাসকে কুফার মসজিদে খলিফা বলে ঘোষণা করা হলে জনসাধারণ তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করে। খিলাফত লাভ করার পর (৭৫০ খ্রিঃ) আবুল আব্বাস ‘আস-সাফফাহ’ (প্রতিশোধ গ্রহণকারী বা রক্তপাতকারী) উপাধি গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর প্রথম কর্তব্য হলো দুনিয়ার বুক হতে উমাইয়া বংশকে সমূলে ধ্বংস করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর পিতৃব্য আবদুল্লাহ-বিন-আলীকে দামেশকের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন এবং সেখানকার উমাইয়াদেরকে বিনাশ করার জন্য নির্দেশ দেন। কোন এক রাতে তিনি উমাইয়া বংশের ৯০ জন লোককে এক নৈতভোজে দাওয়াত করে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।

এভাবে বসরা, মদিনা ও অন্যান্য যেসব স্থানে উমাইয়াদের পাওয়া গেল, সেখানেই তাদেরকে হত্যা করা হলো। উমাইয়া বংশের পুরুষ সদস্যদের খতম করে আব্বাসীয়রা নারীদের দিকে নজর দিল এবং তাদেরকে ক্রীতদাসী হিসেবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল। আব্বাসীয়দের এ নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হাত হতে রক্ষা পেলেন একমাত্র খলিফা হিশামের দৌহিত্র ‘আবদুর রহমান। আবদুর রহমান দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যান এবং সেখান হতে স্পেনে গিয়ে উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠা করেন (৭৫৬ খ্রিঃ)।

আবুল আব্বাসের চরিত্র ও কৃতিত্ব

আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস্-সাফফাহ। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। সিংহাসনে আরোহন করার সাথে সাথে আস্-সাফফাহ উমাইয়াদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালান। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ওয়েল বলেন, অর্থাৎ আবুল আব্বাস শুধু বর্বর পাষণ্ডই ছিলেন না, ভূয়া অঙ্গীকারকারী এবং কৃতঘ্ন বিশ্বাসঘাতকও ছিলেন।

নিষ্ঠুরতা : আবুল আব্বাস একজন নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যে কোন ধরনের কঠোরতা অবলম্বন করতে পারতেন। নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জন্য তাকে ‘রক্ত পিপাসু (আস-সাফ্ফাহ) উপাধি দেয়া হয়।

প্রতিশোধ স্পৃহা : মানবিক দিক দিয়ে তাঁর কৃত নৃশংস কার্যাবলী নিন্দনীয় হলেও তাঁর পূর্ব পুরুষদের প্রতি উমাইয়াদের কৃত অপরাধ এবং বংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিকূল বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এর প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না।

কর্তব্যপরায়ণ ও চরিত্রবান : এ সকল নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও তিনি সদাশয়, কর্তব্যপরায়ণ এবং চরিত্রবান হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মাত্র একজন স্ত্রী ছিলেন। তিনি কোন প্রকার উপ-পত্নী গ্রহণ করেননি। নিজ পুত্র থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজ ভ্রাতা আবু জাফরকে সিংহাসনের জন্য উত্তরাধিকারী মনোনয়ন দান করে এক মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। 

সুশাসক : নিষ্ঠুর হলেও আস-সাফফাহ প্রজারঞ্জক শাসক ছিলেন। তিনি কুফা হতে মক্কা পর্যন্ত দীর্ঘ রাজপথ তৈরি করেন এবং হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য রাস্তার ধারে দূর ফলক স্থাপন ও সরাইখানা নির্মাণ করেন। জ্ঞানী-গুণীদের পৃষ্ঠপোষক আবুল আব্বাস জ্ঞানী, গুণী ও কবি সাহিত্যিকদের সমাদর করতেন এবং তাদের একান্ত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর খিলাফতে ইমাম আবু হানীফা (র) সর্বপ্রথম ফিকহ শাস্ত্রের চর্চা আরম্ভ করেন। আব্বাসীয় সিংহাসনকে কণ্টকমুক্ত করার জন্য যদিও তিনি নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নিয়েছিলেন তথাপিও তিনি একজন সদাশয়, কর্তব্যপরায়ণ এবং প্রজাহিতৈষী শাসক ছিলেন।

উমাইয়াদের নৃশংসভাবে হত্যা করে আবুল আব্বাস ‘আস-সাফফাহ’

খিলাফত লাভের পর আবুল আব্বাস আব্বাসীয়দের ক্ষমতা সুসংহত করার প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি উমাইয়াদের যুলুম-নির্যাতনের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য দৃঢ় শপথ গ্রহণ করেন। তিনি নিজেকে ‘আস-সাফফাহ’ বা ‘রক্ত পিপাসু খেতাবে ভূষিত করেন।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের পতন হলে তিনি প্রতিশোধের আগুন জ্বেলে দেন। তিনি উমাইয়া বংশকে সম্পূর্ণরূপে চিহ্নিত করার এক ভয়াবহ উন্মাদনায় মেতে ওঠেন। ইবনে খালদুন লিখেন যে, “বনু উমাইয়াদের রাজধানী দামেস্ক জয় করে আব্বাসীয় সৈন্যরা সেখানে গণহত্যা চালায়। এ হত্যাকাণ্ডে ৫০ হাজার লোক নিহত হয়। ৭০ দিন যাবত দামেস্কের উমাইয়া জামে মসজিদ ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত হয়েছিল। সকল বনু উমাইয়ার কবর উপড়ে ফেলা হয়।

বনু উমাইয়া শিশুদেরকেও হত্যা করা হয় এবং তাদের রক্তাক্ত লাশের ওপর ফরাশ বিছিয়ে খাদ্য খাওয়া হয়। বসরায় বনু উমাইয়াদের হত্যা করে মৃতদেরকে পা ধরে টেনে এনে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। সেখানে শিয়াল কুকুর তাদের লাশ ভক্ষণ করে। মক্কা মদীনায়ও তাদের সাথে এ ধরনের আচরণ করা হয়। উমাইয়াদের ধ্বংস করার জন্য সেনাপতি ও চাচা আব্দুল্লাহকে কাজে লাগায়। বসরা, মদীনা, মক্কা ও প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন স্থানের উমাইয়া বংশের পুরুষদের শেষ করে দেয়া হয়। স্ত্রী লোকদেরকে ক্রীতদাসী রূপে গণ্য করা হয়। কেবল জীবিত উমাইয়াদের প্রতিই প্রতিশোধ নেয়া হয়নি; মৃত উমাইয়াদের থেকেও প্রতিশোধ নেবার জন্য কবর থেকে তাদের তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

শুধু মুয়াবিয়া ও উমর ইবনে আব্দুল আযীযের কবর যাদের হাত থেকে কোন রকমে রক্ষা পেয়েছিল। আব্বাসীয়দের এ নিধন যজ্ঞের হাত থেকে কোন রকমে পালিয়ে গেলেন খলিফা হিশামের পৌর প্রথম আব্দুর রহমান (আদ-দাখিল)। তিনি স্পেনে গিয়ে মুসলিম শক্তিকে পুনর্গঠিত করে সেখানে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এভাবে একদিকে প্রতিশোধ স্পৃহা, অপরদিকে তাদের সিংহাসনের সপ্তাৰা শত্রুদেরকে উৎখাত করে আবুল আব্বাস তাঁর ক্ষমতাকে সুসংহত করেন।

বিদ্রোহ দমন

আবুল আব্বাসের নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতায় ক্ষুব্ধ হয়ে জনগণ তাঁর পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহ করতে থাকে। বিশেষ করে সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়া, দামেস্ক, হিমস ও প্যালেস্টাইন মুঘল, ইসরাইল এবং কিন্নি সিরিনের জনগণ আব্বাসীয়দের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ করে। তিনি কৌশলে সকল বিদ্রোহ দমন করেন। তবে মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ দমনে আবুল আব্বাসকে বেগ পেতে হয়। তিনি তাদের দমনের জন্য নিজের ভাই আবু জাফরকে সেখানে পাঠান। দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ করে রাখার পর হারবান-এর পতন ঘটে এবং সেখানে আবু জাফর শান্তি ও শৃক্সখলা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর ইরাকের উমাইয়া গভর্নর ইয়াজিদ বিন হুবাইরা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ওয়াসিতে আশ্রয় নেন। তাকে শায়েস্তা করার জন্য আবুল আব্বাস তাঁর ভাই আবু জাফর ও হাসান-বিন কাহতাবকে পাঠান।

প্রশাসনে আত্মীয় ও সমর্থকদের নিয়োগ

আবুল আব্বাস প্রশাসনকে নিজের অনুকূল রাখার জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজ বংশীয় আত্মীয়-স্বজন ও সমর্থকদের নিয়োগ দান করেন। এভাবে খিলাফতকে পুনরায় গোত্রীয়করণ করেন। তিনি নিজ ভাই আবু জাফরকে মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। চাচা দাউদকে হিজাজ, ইয়ামেন ও ইয়ামামার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তাছাড়া আব্দুল্লাহকে সিরিয়ার, সুলাইমানকে বসরার শাসনকর্তা হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। খোরাসানে নিযুক্ত করেন বিশ্বস্ত আবু মুসলিমকে এবং মিশরে নিযুক্ত করেন আবু আইয়ুনকে। উজীরের পদে নিযুক্ত করেন আবু সালমাকে, এবং খালিদ-বিন- বার্মাকিকে অর্থমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন।

সিরিয়ার মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ 

উমাইয়া বংশের প্রতি আব্বাসীয়দের প্রতিশোধমূলক নিষ্ঠুরতা সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার আরব গোত্রগুলোকে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে প্ররোচিত করে। দামেশক, হিস, কিন্নিসরিন, প্যালেস্টাইন, সমুল ও হাররানে আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সিরিয়ার বিদ্রোহগুলো সহজেই দমন করা হয়। কিন্তু মেসোপটেমিয়ার বিদ্রোহ গুরুতর রূপ ধারণ করে। খলিফা তাঁর ভ্রাতা আবু জাফরকে সেখানে প্রেরণ করেন। আবু জাফর কর্তৃক দীর্ঘদিন হাররান অবরুদ্ধ থাকার পর অবস্থা আয়ত্তে আসে এবং সেখানে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাজধানী পরিবর্তন

আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে আবু সালমার যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিল। তিনি কুফাতে আবাসীয়দের উজির ছিলেন। কিন্তু খলিফা তাঁর আনুগত্যের সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলেন; কারণ তিনি হাশেমীয় দলের আলী বংশীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু সালমার প্রভাব হতে মুক্ত হবার জন্য খলিফা প্রথমে কুফা হতে আনবারে রাজধানী স্থানান্তরিত করলেন এবং সেখানে ‘হাশিমীয়া’ নামে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করলেন।

আবু সালমার হত্যা

অতঃপর আবু মুসলিমের পরামর্শে তিনি আবু সালমাকে তাঁর প্রাসাদে রাতে এক ভোজে আমন্ত্রণ করলেন। আবু সালমার প্রভাব প্রতিপত্তিতে আবু মুসলিমের হিংসার উদ্রেক হয়। তিনি তাঁর পথ হতে প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেয়ার জন্য খলিফাকে পরামর্শ দেন। ভোজ শেষে রাজপ্রাসাদ হতে আবু সালমা যখন গৃহে ফিরছিলেন তখন তিনি আবু মুসলিমের লোক দ্বারা নিহত হন।

আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর মৃত্যু ও উত্তরাধিকারী মনোনয়ন

চার বছর তিন মাস রাজত্ব করার পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ ৩০ বছর বয়সে বসন্ত রোগে ইস্তিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর ভ্রাতা আবু জাফরকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান এবং ভ্রাতুষ্পুত্র ঈশাকে তৎপরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। আস-সাফফাহ এক পুত্র মুহাম্মদ ও রাইতা নামক এক কন্যা রেখে যান। পরবর্তীতে আল-মাহদীর সাথে রাইতার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।

সারসংক্ষেপ

উমাইয়া বংশের পতন এবং আব্বাসীয় বংশের উত্থান ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। উমাইয়া বংশের শাসনকর্তাদের নৈতিক অধঃপতন আব্বাসীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে। আব্বাসীয়গণ ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর চাচা আব্বাসের বংশধর। হযরত আব্বাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ইতিহাসে ইবনে আব্বাস নামে পরিচিত। তিনি হযরত আলী (রা)-এর একজন বড় সমর্থক ছিলেন। ইবনে আব্বাসের (রা) মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আলী পরিবারের কর্তৃত্ব লাভ করেন।

হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার দ্বন্দ্ব, মুয়াবিয়ার কূটনীতি, প্রথম ইয়াযিদের নিষ্ঠুরতা, কারবালার নির্মম হত্যাকাণ্ড উমাইয়াদের স্বজনপ্রীতি, আলীর বংশধরদের প্রতি অবিচার প্রভৃতি কারণে আব্বাসীয়গণ মুহাম্মাদের নেতৃত্বে উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত উমাইয়া শাসনের পতন ঘটিয়ে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে। মুহাম্মাদ বিন আলী উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রচার করতে থাকেন যে, একমাত্র আলীর বংশধররাই খিলাফতের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। ফলে আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইবরাহীম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আন্দোলন পরিচালনা করার ফলে বহু লোক এ আন্দোলনের পতাকা তলে সমবেত হয়। এভাবে উমাইয়া বিরোধী আন্দোন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। সর্বশেষ উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ান যখন খারিজী বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত, ঠিক তখনি আবু মুসলিম নসরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। নসর যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হলে খোরাসান আবু মুসলিমের হস্তগত হয়। উমাইয়া খলিফা মারওয়ান কর্তৃক ইমাম ইবরাহীমের নৃশংস হত্যায় ক্ষুব্ধ হয়ে আব্বাসীয়গণ প্রবল আক্রমণ পরিচালনা করে উমাইয়া শাসিত বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেন। ইমাম ইবরাহীমের মৃত্যুর পর আবু মুসলিম আবুল আব্বাসকে খলিফা বলে ঘোষণা করেন।

আনুগত্য লাভ করে তিনি উমাইয়াদের নৃশংসতার প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নিয়ে আস-সাফফাহ উপাধি গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক যাবের যুদ্ধে মারওয়ানের পরাজয়ে উমাইয়া বংশের ভাগ্য রবি চিরতরে অস্তমিত হয়ে যায় এবং উমাইয়া খিলাফতের ধ্বংসস্তূপের ওপর আব্বাসীয়গণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে নব দিগন্তের সূচনা করেন।

আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান ও তাঁর হত্যার কারণ বর্ণনা কর।

উত্তর : আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আৰু মুসলিম খোরাসানীর অবদান : আবু মুসলিম খোরাসানী যার প্রকৃত নাম ইবরাহীম বিন্-উসমান। বাল্যকাল থেকেই তিনি আলী বংশের দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের তত্বাবধানে খোরাসানে সর্বপ্রথম আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন পরিচালনা করেন। তখন ছিল উমাইয়া বংশের শাসনামল। উমাইয়া শাসনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা ছিল, তাই তিনি উমাইয়া শাসনের অবশান ঘটিয়ে দেশে আব্বাসী শাসন কায়েম করার জন্য নেতৃত্ব দেন। 

১৩০ হিজরিতে তিনি উমাইয়া শাসকদের পরাস্ত করে খোরাসান দখল করেন। ১৩২ হিজরিতে কুফায় কার্যরত হাশেমী বংশের নেতা আবু সালমাহকে পরাস্ত করে এবং বাসরার গভর্নরকে পরাজিত করে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেন।

আবু মুসলিমের দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের মৃত্যুর পর, ভ্রাতা আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ। আফসাফ্‌ফাহ ১৩২ হিজরি মুতাবিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রশাসনিকভাবে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আব্বাসী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। এ-ব্যাপারে আবু মুসলিম খোরাসানীর যথেষ্ট সহযোগিতা ও অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল।

উমাইয়া বংশকে নিপাত করে আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান অপরিসীম। আবুল আব্বাস সাফ্ফার শাসনামলে খিলাফত-বিদ্রোহীদের বীরত্বের সহিত দমন করে আব্বাসী খিলাফতকে শক্তিশালী ও কণ্টকমুক্ত করেন।

আব্বাসী খিলাফতের দ্বিতীয় খলীফা আবু জা’ফর মনসুর খিলাফতির আসন গ্রহণ করলে – খিলাফতের অন্যতম দাবিদার সিরিয়ার শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ্ বিন আলী তঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে নাসিবিনের যুদ্ধে আব্দুল্লাহ্ বিন্ আলীকে চরমভাবে পরাস্ত করে আবু মুসলিম এক অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের আয়ুস্কালে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, রণনৈপুণ্যতা ও অসীম বীরত্বের দ্বারা তিনি দীক্ষাগুরু ইমাম ইবরাহীমের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেন।

হত্যার কারণ : অর্থই অনর্থের মূল! অপরিসীম ক্ষমতা ও অধিক জনপ্রিয়তা অনেক সময় ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এইরূপ কারণ আবু মুসলিমদের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। আবু মুসলিম পারস্যবাসীদের উপর রহস্যময় ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন – যা খলীফা আবু জা’ফর মনসুরের মনে ভয় ও ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আবু মুসলিম খোরাসানী অগাধ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে লাগলেন; খলীফা আবু জা’ফরকে পরওয়া না করে নিজের ইচ্ছায় অনেক কাজ করতেন। আবু মুসলিম ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে আব্বাসীয় অন্যতম নেতা উসমান বিন কাসীরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেন। ফলে খলীফা মনসুর তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হন। এইরূপে আবু মুসলিমদের ঔদ্ধত্য, দাম্ভিকতা ও প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তি দেখে খলীফা মনসুর আশঙ্কা করেছিলেন যে, হয়তো সে অদূর ভবিষ্যতে আব্বাসীয় খিলাফত ছিনিয়ে নিতে পারে। তাই, এইরূপ সম্ভাব্য বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য খলীফা আবু জা’ফর মনসুর আবু মুসলিম খোরাসানীকে হত্যা করেছিলেন।

আব্বাসীয় বংশের বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে বর্ণনা কর।

উত্তর : হজরত আব্বাস (রা:) এর নামানুসারে এই বংশের নামকরণ হয় আব্বাসী বংশ। এই বংশের প্রত্যেক খলীফাকে বলা হয় আব্বাসী খলীফা এবং তাঁদের সাম্রাজ্যকে বলা হয় আব্বাসী সাম্রাজ্য। আব্বাসী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফাহ্। আব্বাসী খিলাফত ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, পাঁচশ বছরেরও অধিককাল পৃথিবীর বুকে স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। আব্বাসী খিলাফত ছিল মূলতঃ ইসলামি সাম্রাজ্য ও মুসলিম রাজতন্ত্র। খলীফাই ছিলেন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। খলীফার মৃত্যুর পর তাঁরই সন্তান বা উত্তরাধিকারীগণ পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হতেন, কিংবা খলীফা পূর্ব থেকেই কাউকে পরবর্তী খলীফা হিসাবে মনোনয়ন করে যেতেন।

আব্বাসীয় খলীফাগণ নিজেকে ইমাম ও ধর্মীয় প্রধান হিসাবে উল্লেখ করতে গর্ববোধ করতেন। খিলাফতের প্রথম যুগের খলীফাগণ কুরআন ও সুন্নাহ্র বিধান অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তাঁরা শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আলীম-উলামা ও মুফ্‌তীগণের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। যদিও পরবর্তীকালের কিছু খলীফা গর্ব ও বিলাসিতায় পড়ে নিজস্ব মতবাদ ঢুকিয়ে দিয়ে স্বপ্রণীত আইন-কানুন দ্বারা রাজ্য পরিচালনা করতেন। উক্ত খলীফাগণ জাতীয় ও ধর্মীয় স্বার্থের তুলনায় ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিতেন।

আব্বাসী বংশের খলীফাগণ ছিলেন ন্যায়-নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক। তাঁদের শাসনব্যবস্থায় ছিল জাতি, ধর্ম, গোত্র-নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান অধিকার। তাঁরা দেশে ন্যায়-নিষ্ঠা কায়েম করে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। বিদ্রোহী ও দুর্বৃত্তদের দমন করে জনগণের নিরাপত্তা কায়েম করা ছিল তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য।

নাগরিকগণকে আদর্শবান ধার্মিক-নাগরিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল তাঁদের এক অন্যতম আদর্শ । আব্বাসীয় খলীফাগণ ইসলামি ধ্যান-ধারণার প্রকৃতি ও ইসলামি জীবনব্যবস্থার স্বরূপ নির্ধারণ করেছিলেন। যা আজও পৃথিবীর বুকে অক্ষুন্ন আছে। হাদীস সংকলন, ফিকাহ্ শাস্ত্রের উদ্ভাবন, আরবি সাহিত্যের জাগরণ সহ পার্থিব শিক্ষা বিস্তার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এবং বৈদেশিক শাসকগণের সহিত মৈত্রী বন্ধন স্থাপন ছিল আব্বাসী বংশের এক নীতিগত বৈশিষ্ট্য। আব্বাসী বংশের খলীফাগণ ছিলেন নিরঙ্কুশ ও নিজস্ব ক্ষমতায় বিশ্বাসী। তাঁরা জনসমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন না। শাসন ব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে জনসাধারণের কোনো ভূমিকা ছিল না।

উজির ও প্রধানমন্ত্রী পদের সৃষ্টি ছিল আব্বাসী শাসনামলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। শাসক হিসাবে আব্বাসী বংশের খলীফাগণ ছিলেন বিশেষ দক্ষ। তাঁরা ছিলেন সর্বগুণের অধিকারী। শৌর্য-বীর্য ছিল তাঁদের বংশগত বৈশিষ্ট্য। তাঁরা ছিলেন সমরকৌশলী, প্রজা হিতৈষী, দানবীর ও দয়ালু। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকরণে তাঁদের অবদান ছিল অপরিসীম।

আব্বাসী যুগ ছিল সমৃদ্ধশালী জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাফল্য তাঁদের এক মহান কৃতিত্ব। বীরত্বে, ন্যায়-নিষ্ঠায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আব্বাসীয় বংশ পৃথিবীর ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

আব্বাসী যুগের প্রথম খলীফা কে ছিলেন ? কিংবা, আবুল আব্বাস আসাফ্ফাহ্ কে ছিলেন ? আজ তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা দাও। (২০০৮, ১০, ১২,১৭,১৮,১৯)

উত্তর : আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ আস্সাফ্‌ফাহ্ ছিলেন আব্বাসী যুগের প্রথম খলীফা এবং আব্বাসী বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি খিলাফতের সিংহাসনে আরোহণ করেন। আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফাহ্ খিলাফত গ্রহণ করার পর বিভিন্ন প্রদেশে শাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর শাসনামলে হেযায প্রদেশের শাসক ছিলেন ইয়াযিদ বিন উবাইদুল্লাহ্। ইয়ামানের শাসক ছিলেন মুহাম্মদ বিন ইয়াযিদ, বাসরার শাসক সুলাইমান বিন আলী, আওয়াযের শাসক ইসমাইল বিন আলী, দামেশকের শাসক আব্দুল্লাহ্ বিন আলী এবং খোরাসানের শাসক ছিলেন আবু মুসলিম খোরাসানী। আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফার আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আবু মুসলিম খোরাসানীর অবদান অপরিসীম।

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খলীফা আবুল আব্বাস সাফ্ফাহ্ প্রথমে উমাইয়া বংশের লোকদিগকে হত্যা করার প্রকাশ্য নির্দেশ দেন। তিনি উমাইয়া বংশকে নির্দয়ভাবে ধ্বংস করে আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর, এ কাজে পুরোপুরি মদত দান করেছিলেন আবু মুসলিম খোরাসানী এবং কুফার প্রধান উজির আবু সালমাহ্। তারা উমাইয়া বংশের লোকদিগকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন, বহু ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেন, নারীদের দাসীতে পরিণত করেন।

তাঁদের নির্মম অত্যাচারের ফলে সিরিয়া, দামেশক, হিম্স, ইরাক, প্যালেস্টাইন প্রভৃতি দেশে খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দমন করতে খলীফা আপন ভ্রাতা আবু জা’ফারকে নিযুক্ত করেন। আবু জা’ফর কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করেন। খলীফার পিতৃব্য ছিলেন আব্দুল্লাহ্ বিন আলী, উমাইয়াদের বিনাশ করতে তাকে দামেশকের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তাঁর শাসনামলে উমাইয়া শাসক ইয়াযিদ বিন হুবাইরাকে বন্দী করে শেষে হত্যা করা হয়।

খলীফা আবুল আব্বাস সাফ্ফাহ্ তাঁর প্রধান উজির আবু সালমাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেন। খলীফা আবুল আব্বাস সাফ্ফার রাজত্বকালে দেশের মধ্যে বিশেষ শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছিল।

খলীফা বিদ্রোহীদের প্রভাব থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য রাজধানী কুফা থেকে আবারে স্থানান্তরিত করেন। আব্বারে তিনি ‘হাশেমিয়া’ নামে একটি সুরক্ষিত রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন। আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ্ সাফ্ফাহ্ তাঁর শাসনামলে প্রচুর রক্তপাত ঘটান এবং অমানুসিক নিষ্ঠুরতা ও প্রতিহিংসার পরিচয় দেন। যার কারণে তাঁকে ‘আস্সাফ্ফাহ্’ প্রতিহিংসাকারী বা প্রচুর রক্তপাতকারী নামে অভিহিত করা হয়।

নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী হলেও তিনি শাসক হিসাবে ছিলেন একজন দক্ষ শাসন এবং ব্যক্তি হিসাবে ছিলেন তিনি সদগুণের অধিকারী। আপন প্রজাদের প্রতি ছিলেন সদয় ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান। বিদ্রোহী ও দুর্বৃত্তদের দমন করতে এবং দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন।

জনহিতকর কাজে তাঁর যথেষ্ট সুখ্যাতি আছে। প্রজাদের সুখ-সুবিধার জন্য তিনি বহু রাস্তা-ঘাট, মাদ্রাসা-মসজিদ, সরাইখানা, চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করেন। কৃষিকাজের উন্নতির জন্য সেচ ব্যবস্থা চালু করেন।

আবুল আব্বাস সাফ্ফাহ্ চার বছর তিন মাস রাজত্ব করার পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে বসন্ত রোগে মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আপন ভ্রাতা আবু জা’ফর মনসুরকে আব্বাসী বংশের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেন এবং আব্বাসী খিলাফতের ভিত্তিকে মজবুত করেন।

February 2023
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728  

This Post Has One Comment

Leave a Reply