You are currently viewing শাহজাহান ও মধ্য এশিয়া নীতি
শাহজাহান ও মধ্য এশিয়া নীতি

শাহজাহান ও মধ্য এশিয়া নীতি

সাম্রাজ্যবাদী শাসক হিসেবে শাহজাহান (১৬২৮-১৬৫৮) খ্রিঃ) মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হন। তাঁর মধ্য এশীয় নীতি অনুসর করলে তা বোঝা যায়। খোরাসান মালভূমি এবং অক্ষু নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা তখন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পথের সংযোগস্থল ছিল। এখান থেকে দক্ষিণের পথ ভারতের দিকে, পূর্বের পথ চীনের দিকে, উত্তরের পথ রাশিয়ার দিকে এবং পশ্চিমের পথ অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে সোজা ভূমধ্যসাগরের দিকে বিস্তৃত ছিল। বলাই বাহুল্য বাণিজ্যের কারণে ওই অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অসীম।

উত্তর ভারত জয় করলেও বাবরের পিতৃভূমির প্রতি আকর্ষণ কম ছিল—এমন কথা বলা যায় না। অক্ষু নদীর অপর তীরের যাবতীয় অঞ্চলের ওপর একদা তৈমুরের আধিপত্যকে স্মরণ করেই মুঘলরা ওই অঞ্চলের ওপর নিজেদের পৈতৃক অধিকার কল্পনা করত। বাবর সমরখন্দ এবং বুখারা দখলের চেষ্টা করেছিলেন। হুমায়ুন বাদাখসান পর্যন্ত নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

কিন্তু আকবরের রাজত্বকালে মধ্য এশিয়ার ওই অঞ্চল দখলের জন্য উজবেকের শাসক তো বটেই, এমনকি পারস্য পর্যন্ত আগ্রহী হয়ে পড়ে। পারস্যের সাফাভীদের সঙ্গে উজবেকরা খোরাসানের (পূর্ব পারস্য) অধিকার নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সাফাভীরা আবার অক্ষু নদীর অপর তীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল। খোরাসান মালভূমি এবং অক্ষু নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা তখন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পথের সংযোগস্থল ছিল।

এখান থেকে দক্ষিণের পথ ভারতের দিকে, পূর্বের পথ চীনের দিকে, উত্তরের পথ রাশিয়ার দিকে এবং পশ্চিমের পথ অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে সোজা ভূমধ্যসাগরের দিকে বিস্তৃত ছিল। বলাই বাহুল্য বাণিজ্যের কারণে ওই অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অসীম।

উজবেকদের দ্রুত ক্ষমতা বিস্তার স্বাভাবিকভাবেই মুঘলদের ভালো লাগে না এবং তা প্রতিরোধের জন্য মুঘল সম্রাটরা সাফাভীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। সাফাভীদের সঙ্গে কোনোরকম সীমান্ত গোলযোগ ছিল না—একমাত্র ব্যতিক্রম অবশ্য কান্দাহার। অবশ্য তাদের সঙ্গে ধর্মীয় বিরোধ ছিল একটি।

সাফাভীরা ছিল শিয়া এবং সুন্নিদের বিপুলভাবে নিধন করতে তারা মদত জোগাত। অপরদিকে উজবেক এবং মুঘলরা ছিল সুন্নি। কিন্তু ধর্মীয় কারণ মুঘলদের দৃষ্টিকে কখনো আচ্ছন্ন করেনি। উপরন্তু উজবেকরা কাবুল থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অঞ্চলে আফগান এবং বালুচ উপজাতিগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুঘল সীমান্তকে বিব্রত করে রাখছিল।

ভারতে মুঘল শক্তি বিস্তারের যুগে বাদাখসান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে চেঙ্গিস খানের বংশধরদের একটি শাখা — যারা অস্ট্রাখান নামে পরিচিত, তারা শাসন করছিল। কিন্তু রাশিয়ার উত্থানের ফলে ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে অস্ট্রাখানদের নেতা ইয়ার মহম্মদ খান ও তাঁর পুত্র জামি খান অক্ষু নদীর অপর তীরে গিয়ে আশ্রয় নেন।

সেখানকার শাহিবানিদ (শাসক) ইসকান্দার খান তাঁদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। অস্ট্রাখানরা এই অঞ্চলকে নিজেদের মাতৃভূমিরূপে গ্রহণ করল এবং ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে ইয়ার মহম্মদের প্রপৌত্র ইমাম কুলি সমরখন্দের সিংহাসনে উপবেশন করেন। তাঁর ভাই নজর মহম্মদকে চালব প্রদেশের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আব্দুল্লাহ খান উজবেকের নেতৃত্বে উজবেক শক্তি আকবরের রাজত্বকালে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৫৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ খান বলখ দখল করেন। বল্‌খ এবং বাদাখসান অঞ্চলদুটি মুঘল সাম্রাজ্য ও উজবেক এলাকার অন্তবর্তী অঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহ তহমাস্পের মৃত্যুর পর সেদেশে নানাবিধ অসন্তোষ দেখা যায়। ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ খান আকবরের কাছে যৌথভাবে পারস্য অভিযানের প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল এভাবেই ইরাক, খোরাসান এবং পারস্য থেকে শিয়া ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করা যাবে। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে আকবর কোনও অভিযানে আগ্রহ প্রকাশ করেননি।

১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ খান বাদাখসান জয় করে নিলে সে অঞ্চলের অধিপতি মির্জা সুলেইমান ও তাঁর পৌত্র শাহরুখ মির্জাকে আকবর নিজের রাজ্যে আশ্রয় দেন। এ ঘটনার অল্পদিনের মধ্যেই আব্দুল্লাহ খোরাসান আক্রমণ করেন। আকবর সম্ভবত ওই অঞ্চলে সম্প্রসারণে তখন আগ্রহী ছিলেন না। তিনি মোটামুটিভাবে হিন্দুকুশ পর্বতকে মুঘল সাম্রাজ্য এবং উজবেক এলাকার মধ্যে সীমান্ত হিসাবে মেনে নেন।

অর্থাৎ বল্‌ল্খ এবং বাদাখসানের ওপর আকবর তাঁর নৈতিক অধিকার ছেড়ে দেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে কান্দাহার পুরো দখল করে তিনি সেখান থেকেই সীমান্ত রক্ষার সামরিক বন্দোবস্ত করেন। কান্দাহারের প্রতি মুঘলদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল। এই প্রদেশের অধিকার একদা তৈমুরের ছিল এবং ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তা বাবরের জ্ঞাতিদের দখলে ছিল। ওই বছর উজবেকরা তা কব্জা করলেও বাবর অল্প সময়ের জন্য কান্দাহার নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।

কাবুল অধিকার করার সময় থেকেই বাবর কান্দাহারের সামরিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। আকবর সিন্ধু এবং বালুচিস্তান জয় করার পর কান্দাহার আরও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে ওঠে। কান্দাহার ছিল উর্বর এলাকা যেখানে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ভালো। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যপথও গিয়েছিল মুলতান ও কান্দাহার হয়ে। এ কারণেই কান্দাহারের ওপর একই সঙ্গে পারস্যের সাফাভী এবং উজবেকদের নজর ছিল এবং হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তা শাহ তহমাস্প নিজের দখলে নিয়েছিলেন।

১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল্লাহ খান উজবেকের মৃত্যুর পর শাহ আব্বাস খোরাসান জয় করে আকবরের কাছে কান্দাহার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। আকবরের মৃত্যুর পরই কান্দাহার অবরুদ্ধ হয়। কিন্তু মুঘল বাহিনীর আগমনের ফলে শাহ আব্বাস অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন। এ তিক্ততার অবসানের উদ্দেশ্যে আব্বাস ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের কাছে মিত্রতার প্রস্তাব দিয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন।

সম্ভবত আব্বাস কালক্ষেপের নীতি নিয়েছিলেন ভালোমতো সামরিক প্রস্তুতি গড়ে তোলার জন্য। তিনি কূটনীতির দরজাও খোলা রেখেছিলেন এবং একাধিকবার জাহাঙ্গীরের কাছে কান্দাহার ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। জাহাঙ্গীর কিন্তু ছিলেন উদাসীন। এই অবস্থার সুযোগে ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে যখন পারস্য কান্দাহার আক্রমণ করে সেখানে মাত্র ৩০০০ মুঘল সৈন্য ছিল প্রতিরোধের জন্য। কান্দাহার পারস্যের পদানত হল।

কান্দাহার পারস্যের হাতে চলে যাওয়ায় উজবেকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শাহ আব্বাস দ্রুত তুর্কীদের পরাজিত করে বাগদাদ অধিকার করায় পারস্যের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। ফলত শিয়া পারস্যের বিরুদ্ধে সুন্নি উজবেক, তুর্কী এবং মুঘল জোটের জন্য নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে উজবেক নেতা ইমাম কুলি জাহাঙ্গীরের কাছে এ জাতীয় প্রস্তাবই রেখেছিলেন। শাহজাহান সম্রাট হলে একই ধরনের প্রস্তাব উজবেক পক্ষ থেকে তাঁর কাছে দেওয়া হয়। শাহজাহান ইমাম কুলি ও তাঁর ভাই নজর মহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে অটোমান সুলতান চতুর্থ মুরাদের কাছে কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য পারস্যের বিরুদ্ধে একযোগে ভারত, তুরান এবং তুরস্ক থেকে অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এখানে তিনি ধর্মীয় কারণের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। কিন্তু এ পথে তিনি অগ্রসর হতে পারেননি।

১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান কান্দাহারের ইরানী শাসনকর্তা আলি মর্দান খানকে মুঘল পক্ষে চলে আসতে প্ররোচিত করেন। এ ঘটনা পারস্যের নতুন তথা অত্যাচারী শাসক শাহ সাফির মনোমতো ছিল না। শাহজাহান পারস্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাত এড়ানোর জন্য কান্দাহারের বাবদে বার্ষিক রাজস্ব পাঠানোরও অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু শাহ সাফির কান্দাহার দখলই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ প্রদানের শর্তে শাহ সাফি অটোমান সুলতানের কাছ থেকে কান্দাহার অভিযানের সমর্থন আদায় করে নেন। এ সংবাদ শাহজাহানের অজানা ছিল না।

তিনি তৎক্ষণাৎ স্বয়ং কাবুলে উপস্থিত হয়ে বিপুল গোলন্দাজ সেনার সমাবেশ ঘটান এবং জ্যেষ্ঠপুত্র দারাকে সেনা পরিচালনার দায়িত্ব দেন। মুঘলপক্ষের বিপুল সমর প্রস্তুতির জন্য সম্ভবত শাহ সাফি দুইবছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অতঃপর ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কান্দাহার অভিযানে অগ্রসর হন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য যে পথেই অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। এ ঘটনার পর পারস্যে নানাবিধ অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দেখা দেয় এবং সেদিক থেকে মুঘলদের বিপদের সম্ভাবনাও দূরীভূত হয়।

ইমাম কুলির ভাই নজর মহম্মদ কেবলমাত্র বলখের অধিকার নিয়ে তুষ্ট থাকার পাত্র ছিলেন না। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর অব্যবহিত পর ভারতের রাজনৈতিক জটিলতার সুযোগে নজর মহম্মদ কাবুল অধিকারে অগ্রসর হন। একই সময়ে সীমান্তবর্তী উপজাতিগুলির হাতে মুঘল সেনাদের পরাজয় তাঁকে আরও উৎসাহিত করেছিল। ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে নজর মহম্মদ কাবুল অধিকার করে নেন। কাবুলের প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা বা রসদ তখন ছিল না। কিন্তু শাহজাহান দ্রুত কাবুল পুনরুদ্ধারে সেনা পাঠালে নজর মহম্মদ কাবুলের অধিকার ছেড়ে দেন।

কাবুল ফিরে পাওয়ার পরও শাহজাহান ইমাম কুলির সঙ্গে মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে অস্ট্রাখানদের কাছ থেকে বামিয়ান দখলে নিয়ে শাহজাহান নজর মহম্মদের সামনে দুইরকম বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন—(১) ইমাম কুলির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য উজবেক শিবিরে ফাটল ধরানো এবং (২) যে-কোনো সামরিক অভিযানের জন্য মুঘলদের আগ্রহ। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে নজর মহম্মদের দূত ওয়াকাই হাজী মুঘল দরবারে আসেন এবং এর পরবর্তী ছয় বছরে দুই তরফে একাধিক দূত বিনিময়ে হয়। কিন্তু শাহজাহান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে আদৌ তুষ্ট হতে পারছিলেন না।

কাবুলে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. বি. পি. সাকসেনা বলেন যে, সম্রাট অভিযানের প্রস্তুতির জন্যই অক্ষু নদীর অপর তীর সরেজমিনে তদন্ত করতে সেখানে গিয়েছিলেন। শাহজাহানের কাবুলে উপস্থিতি এবং তাঁর আগ্রাসী সমরসজ্জায় ইমাম কুলি ও নজর মহম্মদ উভয়েই ভীত হয়ে ওঠেন। ইমাম কুলি অন্ধ হয়ে যাওয়ায় নজর মহম্মদের গতি অপ্রতিহত হয়ে পড়ে। নজর মহম্মদ হিসার ও সমরখন্দ দখলে নিয়ে বুখারায় নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করেছিলেন।

নজর মহম্মদ ছিলেন উদ্যমী এবং দক্ষ প্রশাসক। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তিনি মধ্য এশিয়ার এক বড়ো অংশে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু বুখারায় শীঘ্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় নজর মহম্মদ নিজের পুত্র আব্দুল আজিজকে সেই বিদ্রোহ দমনে পাঠান। আজিজ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেই বুখারার সম্রাট হয়ে বসেন। নজর মহম্মদ তখন পুত্রের দ্বারা বিব্রত এবং বল্‌ল্খ ছাড়া তাঁর আশ্রয় নিরাপদ নয়। এমন অবস্থায় তিনি শাহজাহানের সাহায্য প্রার্থনা করেন।

শাহজাহান তৎক্ষণাৎ ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে লাহোর ছেড়ে কাবুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং পুত্র মুরাদের নেতৃত্বে এক বিরাট সেনাদল নজর মহম্মদের সাহায্যের জন্য পাঠান। ৫০ হাজার অশ্ব, ১০ হাজার পদাতিক সহ (যাদের মধ্যে গোলন্দাজিরাও ছিল) রাজপুত সেনারা ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মে কাবুল ত্যাগ করে।

শাহজাহান মুরাদকে নজর মহম্মদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এমনকি সমরখন্দ এবং বুখারা ফিরে পেতে তিনি নজর মহম্মদকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দিতেও বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মুরাদের দূরদৃষ্টির অভাব ছিল।

শাহজাহান বল্থ এবং বুখারায় মুঘলদের এক মিত্রকে চেয়েছিলেন যিনি মুঘলদের প্রয়োজনে সাহায্য করতে পারেন। মুরাদ এসব চিন্তা না করেই এককভাবে বলখের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। কাবুল ত্যাগ করে মুরাদ চারিকারানে পৌঁছান। সেখান থেকে অপর সেনাপতি কুলিজ খান ও অন্যান্যদের ঘোরী এবং খামরাদ অভিযানে পাঠিয়ে মুরাদ স্বয়ং বাদাখসান অভিমুখে রওনা দেন। কিন্তু দুর্গম পথ ও তুষারের জন্য পথ চলাচল খুব সহজ ছিল না।

তথাপি ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের মধ্যে খামরাদ ও ঘোরী মুঘলরা জয় করে নেয়। অপরদিকে মুরাদ ১৫ জুন বাদাখসানের পথে শোরাবে এসে উপনীত হন। এখান থেকেই তিনি বল্‌ল্থ প্রদেশের পূর্ব সীমান্তে এসে ঘাঁটি তৈরি করেন। মুরাদ বল্‌ল্খ দুর্গ (যেখানে নজর মহম্মদ অবস্থান করছিলেন) পর্যন্ত নিজের দখলে নেওয়ার ব্যবস্থা করলে নজর বল্‌ল্খ ছেড়ে পলায়ন করেন। অর্থাৎ নজর মহম্মদের সমর্থন ছাড়া মুরাদ বল্‌ল্খ দখলে বাধ্য হলেন। কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা ছিল ভীষণভাবে মুঘলবিরোধী।

শাহজাহান পারস্যে নজর মহম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে বল্‌ল্থ অধিকারের একটি যুক্তি পেশ করেছিলেন। যুক্তিটি ছিল যে, নজর মহম্মদ বল্‌ল্খ ছেড়ে চলে আসার জন্যই তাঁকে সে অঞ্চলটি সাময়িকভাবে দখল করতে হয়েছে। অবশ্য বল্থ ছেড়ে যাওয়ার কোনও লক্ষণ মুঘলরা দেখায়নি। কিন্তু বল্‌ল্খ ও বাদাখসান শাসন করা ছিল খুবই কঠিন। অক্ষু নদীর দক্ষিণ তীর পর্যন্ত ভূখণ্ড মুঘলদের করায়ত্ত হয় যার মধ্যে বলখের মতো সমতল ক্ষেত্র যেমন ছিল তেমনি ছিল বাদাখসানের মতো পার্বত্য ও খরস্রোতা ঝরণার দেশ। মুঘলদের রসদের পরিমাণ ছিল সীমিত।

প্রতিরোধব্যূহ রচনার জন্য তারা দুটি সারিতে তিনটি অগ্রবর্তী সেনা ছাউনি তৈরি করে। সেগুলি ছিল বাদাখসানের পশ্চিম সীমান্ত বরাবর হজরত ইমাম থেকে হিন্দুকুশের ঘনজান এবং ইন্দ্রাব। অপরটি ছিল অন্দখুদ থেকে সবেরখান অতিক্রম করে সরপুল পর্যন্ত। কিন্তু উত্তর দিক—যেদিকে অক্ষু নদী প্রবাহিত সেদিকটি ছিল উন্মুক্ত। অর্থাৎ উজবেকদের পক্ষে সে পথে মুঘল এলাকা আক্রমণ করা সহজ ছিল।

মুঘলদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে নজর মহম্মদের পুত্র আব্দুল আজিজ অক্ষু নদীর অপর তীরে উজবেক উপজাতিগুলিকে একত্রিত করে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার একটি দল তৈরি করে ফেলেন। দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং মধ্য এশিয়ার কঠিন জলবায়ুর জন্য মুরাদ ভারতে ফিরে আসার জন্য আবেদন করেন। আব্দুল হামিদ লাহোরী লিখেছেন যে, সম্রাট এজন্য মুরাদের ওপর এতই ক্ষিপ্ত হন যে, তিনি কিছুদিন মুরাদের মনসব পদ এবং মুলতানের জাগীর বাজেয়াপ্ত করে নেন। কিন্তু বলখে নিযুক্ত মুঘল এবং রাজপুত অভিজাতরা মুরাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইলে অবস্থা জটিল হচ্ছে দেখে শাহজাহান পুত্র আওরঙ্গজেবকে সেখানে পাঠালেন।

১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে আওরঙ্গজেব বলখ এসে পৌঁছান। আওরঙ্গজেব আব্দুল আজিজের সমরসজ্জার বিরোধে কোনও ব্যবস্থাই নিলেন না বা নদী অতিক্রম করে অক্ষুর অপর তীরে পৌঁছানোর আগ্রহ দেখালেন না। বলখের কাছে অক্ষুর গভীরতা ছিল সামান্য এবং সহজেই তা অতিক্রম করা যেত। তিনি এ প্রান্তে শক্তিশালী সেনাশিবির গড়ে তোলেন এবং গোলন্দাজ বাহিনীকে নিজের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুত রাখেন।

মুঘলদের সমর প্রস্তুতির যথাযথ সংবাদ আব্দুল আজিজ রাখেননি এবং কার্যত বিনা প্রতিরোধে তিনি বলখে প্রবেশ করেন। কিন্তু বলখের অভ্যন্তরে মুঘল গোলন্দাজিদের প্রতিরোধের মুখে তিনি ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে বলখ ছাড়তে বাধ্য হলেন। যে বিরাট সেনার সমাবেশ আব্দুল আজিজ করেছিলেন তা এই ঘটনার পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

ড. সতীশচন্দ্রের বক্তব্য যে, বল্‌খ অভিযানের এই সহজ সাফল্যের পর শাহজাহান সমরখন্দ এবং বুখারা অভিযান করতে পারতেন, কারণ ইতিপূর্বে দ্বিতীয় শাহ আব্বাসকে এক পত্রে তিনি স্পষ্টই জানিয়েছিলেন, বল্‌খ জয় হবে তাঁর বুখারা এবং সমরখন্দ অভিযানের প্রাথমিক ধাপ।

এমনকি মুরাদ যখন বলখে অবস্থান করতে অনীহা প্রদর্শন করেছিলেন তখনও সম্রাট পুত্রকে সমরখন্দ ও বুখারা জয়ের পরবর্তী সময়ে সে অঞ্চলগুলির শাসনকর্তার পদ দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু মুঘলদের বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীদের মনোভাব ছিল খুবই বিরূপ। একদিকে বিভিন্ন উজবেক গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপর দিকে ভারতীয় অভিজাতদের সে কাজের জন্য বলখে রাখা—এ দুটোই শাহজাহানের হাতে ছিল না।

অবস্থার গুরুত্ব অনুভব করে তিনি তাঁর পূর্বেকার সিদ্ধান্তেই ফিরে যেতে চাইলেন। অর্থাৎ‍ নজর মহম্মদকে পুনরায় বলখের দায়িত্ব সমর্পণ করা। নজর মহম্মদ তখন পারস্যের শাহের দরবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ ঘটনা শাহজাহানকে চিন্তিত করেছিল। উজবেক ও পারস্যের যুগ্ম বাহিনী মুঘলদের পক্ষে যে শুভ নয় এটা তিনি ভালোই জানতেন। অপরদিকে নজর মহম্মদ এবং তাঁর পুত্র আব্দুল আজিজ উভয়েই মুঘলদের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে তখন আগ্রহী।

কিন্তু শাহজাহান এ কাজের মূল্যস্বরূপ নজর মহম্মদকে আওরঙ্গজেবের কাছে নিজে উপস্থিত থেকে আনুগত্য প্রদর্শন করতে বলায় অবস্থা জটিল হয়। উজবেক প্রধান তাঁর আত্মাভিমান ত্যাগ করে একাজ করতে চাইলেন না। এছাড়াও তিনি মুঘল শিবিরের ভিতরের খবর রাখতেন, মুঘলরা যে দীর্ঘদিন ওই অঞ্চলে থাকতে চাইবে না এটা তাঁর কাছে তখন পরিষ্কার। তাঁর অনুমানই সঠিক প্রমাণিত হল। ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর মুঘলবাহিনী বল্‌ল্খ ত্যাগ করল। শীতের মধ্যে শত্রু উজবেকদের আক্রমণে মুঘলবাহিনীর তখন ছন্নছাড়া অবস্থা। তাদের চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা করল একমাত্র আওরঙ্গজেবের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

আধুনিককালের ঐতিহাসিকদের কাছে শাহজাহানের বল্‌ল্খ অভিযান যথেষ্ট চর্চার বিষয়। শাহজাহান যে অক্ষু নদী পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করতে আগ্রহী ছিলেন তার পিছনে যথেষ্ট বাস্তববোধ প্রমাণ করেছিল। কারণ অক্ষু নদীকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। একই সঙ্গে মুঘলদের পিতৃভূমি সমরখন্দ ও বুঝারা জয়ের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে হলে অক্ষু নদী অতিক্রম করার প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের ভূমি তেমন উর্বরা ছিল না যে রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে সেগুলি লোভনীয়।

সমসাময়িক প্রতিবেদক যেমন লাহোরী ও শাহজাহানের বল্‌ল্থ অভিযান সমর্থন করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, উজবেকদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার এবং নজর মহম্মদকে দমন করার স্বার্থেই তা করা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা শাহজাহানের অভিযানকে নেহাতই আকস্মিক ও পূর্বপরিকল্পনা রহিত বলে বর্ণনা করেছেন। এমনকি তিনি তৈমুরের অধিকৃত রাজ্য ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন পর্যন্ত দেখতেন বলে অনুমান করা হয়। অবশ্য একথা অনস্বীকার্য যে, শাহজাহান উত্তর-পশ্চিমে কাবুল থেকে কান্দাহার পর্যন্ত এলাকায় মুঘল সীমানা সুরক্ষিত করার তাগিদেই বল্‌খ অভিযান করেন। একই উদ্দেশ্যে উজবেকদের দমনও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শাহজাহান সফল হতে পারেননি। এর ফলে পিতৃভূমি পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন অধরাই থাকল।

Leave a Reply